ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ, ২০১৭
  • ৪৬২ বার পঠিত

ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সেবার বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মাস্টারকার্ড। বাংলাদেশের বাজারে দুই দশক পেরিয়ে গেছে তাদের। কয়েক বছর আগে মাস্টারকার্ড ভোক্তা আত্মবিশ্বাসের আঞ্চলিক সূচকে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক জরিপে দেখা গেছে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বাংলাদেশে। এর নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বাংলাদেশে মাস্টারকার্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। দীর্ঘ ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি এসিআই, বার্জার, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আলোচনায় উঠে আসে ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড ও ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সেবার বাজার, লেনদেন ডিজিটালাইজেশনের গতি-প্রকৃতি, করণীয়সহ নানা ইস্যুও।
মাস্টারকার্ড ভোক্তা আত্মবিশ্বাসের একটি জরিপ পরিচালনা করে থাকে। গেল অর্ধবার্ষিকীতে আমরা দেখলাম ছয় মাসের ব্যবধানে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সূচক বৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। বিস্তারিত জানাবেন?
বাংলাদেশের এ অগ্রগতিটি উল্লেখ করার মতো। মাস্টারকার্ড বিশ্বব্যাপী প্রায় দুই দশক ধরে এ জরিপ করে আসছে। ছয় মাস পর পর জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশে আমরা কয়েক বছর আগে এ জরিপ শুরু করি।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশ আমাদের জরিপের অন্তর্ভুক্ত। এ অঞ্চলের প্রায় দুই লাখ ভোক্তা জরিপে অংশগ্রহণ করছেন। গেল বছরের দ্বিতীয়ার্ধে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফনটি আমরা দেখলাম বাংলাদেশে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে মাস্টারকার্ড কনজিউমার কনফিডেন্স ইনডেক্সে বাংলাদেশ ১১ দশমিক ২ পয়েন্ট এগিয়ে ৮২ দশমিক ৮-এ উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক অবস্থান অর্জন করেছে। একই সঙ্গে চীনও। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ২ পয়েন্ট এগিয়েছিল।
জরিপটি কীভাবে পরিচালনা করা হয়। এর গ্রহণযোগ্যতা কতটা?
সব দেশেই আমরা থার্ড পার্টি এক্সপার্টদের দিয়ে জরিপের কাজটি করাই। তারা তাদের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে জরিপকার্য পরিচালনা করে। পরবর্তী ছয় মাসে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শেয়ারবাজার, আয়-উন্নতি ও জীবনমান— এ পাঁচটি বিষয়ে ভোক্তাদের মনোভাব, আস্থা, আত্মবিশ্বাস এগুলো যাচাই করাই জরিপের মূল উদ্দেশ্য।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়টি হলো, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ভোক্তারা আগের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন। উপাদানগুলোর মধ্যে দেশে আমরা সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি দেখেছি শেয়ারবাজার নিয়ে। ভোক্তা আত্মবিশ্বাসের উপাদান-সূচক হিসেবে শেয়ারবাজার ২৪ দশমিক ৬ পয়েন্ট বেড়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও নিজের ক্রয়ক্ষমতার ব্যাপারেও আমাদের ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাসটি চোখে পড়ার মতো।
মাস্টারকার্ডের এ জরিপের গ্রহণযোগ্যতা সারা পৃথিবীতেই। একটি দেশের বাজারে যারা কাজ করতে চান, অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বুঝতে চান, ভোক্তাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে ধারণা চান, তারা আমাদের কনজিউমার কনফিডেন্স ইনডেক্সের ওপর আস্থা রাখেন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশের ভোক্তারা অত্যন্ত আশাবাদী, দেশে ইলেকট্রনিক পেমেন্টের চর্চাও বাড়ছে। মাস্টারকার্ডের পুরো চিত্রটিকে কীভাবে দেখছেন?
বাংলাদেশের চিত্রটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। প্লাস্টিক কার্ডের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাস্টারকার্ডই ঢাকায় নিজস্ব অফিস করেছে। এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারটি এখনো পর্যন্ত ছোট। তবে জনসংখ্যা, মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতা, জীবনধারা, ব্যয়ের প্রতি মনোভাব এগুলোর দিকে তাকিয়ে মাস্টারকার্ড আশাবাদী যে, বাংলাদেশ ডিজিটাল পেমেন্ট সেবার একটি বড় বাজার হবে।
বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্সের প্রতিবেদনে আমরা দেখছি, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ডকুমেন্টেড লেনদেনের ৬ শতাংশ ডিজিটালি হচ্ছে, টাকার অংকে যা ১২ শতাংশের মতো। এর মধ্যে ব্যাংকের ইলেকট্রনিক ট্রান্সফার, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস), এটিএম মেশিন, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড সবই অন্তর্ভুক্ত। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৫-৬ শতাংশের মতো।
১০ টাকার অ্যাকাউন্টগুলো বাদ দিলেও দেশে প্রায় চার কোটি ইউনিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। এমএফএস অ্যাকাউন্টের ৪০ শতাংশও যদি সক্রিয় ধরি, তাহলেও সংখ্যাটি দেড় কোটির বেশি। প্লাস্টিক কার্ড রয়েছে প্রায় এক কোটি, যার মধ্যে অন্তত এক লাখ ক্রেডিট কার্ড। অন্যদিকে ডেবিট কার্ডগুলোর মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নেটওয়ার্কেই সীমাবদ্ধ। দেশের বাজারে ৩৫ লাখের বেশি ডেবিট কার্ড আমাদের মতো বৈশ্বিক নেটওয়ার্কগুলোর ইস্যুকৃত।
ডিজিটাল পেমেন্টের চর্চা বাড়াতে আমরা পার্টনার ব্যাংক-এনবিএফআইগুলোর সঙ্গে কাজ করছি। সময়ে সময়ে বিভিন্ন ইউসেজ ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে। এসবে ভালো সাড়াও দিচ্ছেন ভোক্তারা। দুঃখজনক হলো, ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ানোর এ প্রচেষ্টার প্রায় সবটাই ইন্ডাস্ট্রি থেকে আসছে। এ গতিতে এগোলে অন্যান্য দেশের সমান হতে বাংলাদেশের অনেক সময় লেগে যাবে।
ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ানোটা কি খুব দরকার?
অবশ্যই। কারণ এক্ষেত্রে প্রতিটি ট্রানজেকশন রেকর্ডেড থাকে এবং পুরো বিষয়গুলো খুব সহজে রিক্যাপ-রিভিউ করা যায়। এর মধ্য দিয়ে আমরা আরো কাঠামোবদ্ধ ও স্বচ্ছ একটি লেনদেন ব্যবস্থা পেতে পারি, যা সরকারকে অনেক বেশি রাজস্ব দেয়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনকে সহজ করবে। ট্যাক্স-ভ্যাটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ডিজিটাল ট্রানজেকশন অনেক ভালো। কারণ একটি রিটেইল স্টোরে নগদ কেনাবেচায় টার্নওভারে তারতম্য করা সম্ভব হলেও ডিজিটালে তা সম্ভব নয়। সারা বিশ্বের অর্থনীতিতেই ভোক্তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশে দেশে সরকারের নীতিতে বিষয়গুলো অ্যাড্রেস করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী ভারতের কথাই দেখুন না। তারাও আমাদের মতোই ছিল। কিন্তু সরকার সেখানে স্ট্রাকচার্ড ডিজিটাল লেনদেন উত্সাহিত করছে। নোট বাতিলের কারণে মানুষের কিছু অসুবিধা হয়েছে সত্য। কিন্তু ফরমাল চ্যানেলে লেনদেন অনেক বেড়েছে। কার্ডের জনপ্রিয়তায়ও বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির প্রথম কিছু দিনে ভারতে ডেবিট কার্ডের ব্যবহার ৫০০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে দেশটির সরকার কার্ডে লেনদেনে কিছু ইনসেনটিভও দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কার্ডে পেট্রল পাম্পের বিল দিতে গেলে ভারতে কমবেশি ৪ শতাংশ সারচার্জ দিতে হতো। নোট বাতিলের পর সেক্ষেত্রে রিবেট দেয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেখানে কার্ডে বিল দেয়ায় অভ্যস্ত হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রিও গ্রাহক বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যার কার্ড নেই, তিনিও ব্যাংক থেকে একটি ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড নিতে উত্সাহিত হচ্ছেন।
রফতানি, রেমিট্যান্স, অভ্যন্তরীণ বাজার সব মিলিয়ে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে সবার পূর্বাভাস ও আশাবাদের কথা আমরা সবাই জানি। সময়ের সঙ্গে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ব্যয়ের ধরন অনেক বদলে যাবে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের চর্চা ও গতি না বাড়লে লোকসানটা সবারই হবে।
আমি মনে করি, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ডিজিটাল পেমেন্ট আরো মনোযোগের দাবি রাখে। সমাজের সব স্তরে ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের প্রচেষ্টার সঙ্গে ডিজিটাল ট্রানজেকশনের ধারণাটিকেও যোগ করা দরকার। ভারতের মতো আমাদের সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে প্লাস্টিক কার্ড ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করবে। সেটি হতে পারে, নগদ প্রণোদনা, হতে পারে কর বা অন্যান্য ছাড়। ভারতের মতো কিছু ডিজরাপ্টিভ সিদ্ধান্তও নেয়া যেতে পারে।
আমরা যতটুকু দেখছি, সরকার ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন, প্রগ্রেসিভ ব্যাংকিং, লেনদেন ডিজিটালাইজেশনের মতো বিষয়গুলোয় যথেষ্ট উদ্যোগী…
আমরাও সেটিই দেখছি। তবে ভোগ ব্যয়ের ব্যাপারে সরকারের একটি রক্ষণশীল অবস্থান আমার চোখে স্পষ্ট। আমার মনে হয়, অর্থনীতি ও জীবনধারায় উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এটিকেও উত্সাহিত করা দরকার। অনেক বিষয় রয়ে গেছে, যেগুলোয় পরিবর্তন দরকার। এজন্য অন্যান্য দেশের নীতিও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
যেমন আমাদের দেশে ক্রেডিট কার্ড করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই টিআইএন নম্বর থাকতে হয়, ১৬ পাতার ফরম পূরণ করতে হয়। আপনারাও জানেন দেশে করদাতার সংখ্যা কত কম। তার মানে করদাতার বাইরে আর কেউ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন না।
এছাড়া পারসোনাল লোনের সিলিং ১০ লাখ টাকা হলেও ক্রেডিট কার্ডে সেটি ৫ লাখ টাকার বেশি না। দেশের বাইরে যাওয়ার সময় আমাদের নাগরিকরা সর্বোচ্চ যে পরিমাণ নগদ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পান কিংবা ক্রেডিট কার্ডে খরচ করার সুযোগ পান, সেটি অনেক বাংলাদেশীর কাছেই অপ্রতুল। দেশে অনেক ব্যবসায়ী-পেশাজীবী রয়েছেন, যাদের নিয়মিতই বিদেশ যেতে হয়, বড় বড় হোটেলে থাকতে হয়। এক সপ্তাহের সফরে গেলে তারা দেখেন তিন দিনের হোটেল বিল দিতে গিয়েই তার অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়ে গেছে। বাকি খরচগুলো মেটাতে তাকে কার্ব মাকেট থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে হয়, যেটি ভালো চর্চা নয়।
আমি বলব, বাংলাদেশের রিজার্ভ যখন ৬ বিলিয়ন ডলার ছিল, তখনকার সে সিলিং ধরে রাখার সুযোগ নেই। এখন বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার, বেড়েছে মাথাপিছু আয়। ব্যয় করার মতো ভোক্তার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনই গভীর হয়েছে তাদের পকেটও। সর্বোপরি ‘সীমাতিরিক্ত’ ব্যয়টি তাদের জন্য একটি প্রয়োজন।
ভারতে বিমানবন্দরে নামলেই দেখবেন, বিভিন্ন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা কাগজপত্র হাতে নিয়ে তাদের ক্রেডিট কার্ড অফার করছেন। ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলা রাজি হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্ডটি অ্যাক্টিভেট করে দেয়া হয়। আমার পর্যবেক্ষণ, যেখানে রক্ষণশীল অবস্থান অত্যাবশ্যক সেখানে দেশটির সরকার তাই করে। আবার সময়ের চাহিদায় তাদের নীতি শিথিল করার দৃষ্টান্তগুলোও অনুসরণীয়।
সর্বশেষে আমার প্রস্তাবনা থাকবে ডিজিটাল লেনদেন উত্সাহিত করতে সরকার নগদ প্রণোদনা প্রচলন করার কথা ভাবতে পারে। প্রতিটি সঞ্চয়ী হিসাবের সঙ্গে বাধ্যতামূলক ডেবিট কার্ড করা যেতে পারে। ক্রেডিট কার্ডের লিমিট ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা করা যেতে পারে, সঙ্গে টিআইএন এর বাধ্যকতা দূরীকরণ ও ট্রাভেলার্স কোটা অন্তত ২০ হাজার ডলারে উন্নীত করা যেতে পারে। আমি মনে করি, এ প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ডিজিটাল ট্রানজেকশন সম্প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরালো হওয়ার পাশাপাশি সরকারের মনিটরিংও সহজ হবে।
সৌজন্যে: বণিক বার্তা, সূত্র ঃ সূত্র বাংলাদেশ বার্তা

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..