তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যেভাবে চলছে ভোটের হিসেব

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১৮
  • ৪৩৭ বার পঠিত

আলোকিত খবর ডেস্ক : রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল – এই তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারারিভযান ২৮শে জুলাই শনিবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে এবং ভোটাররা সোমবার তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন যে কোন প্রার্থীকে তারা মেয়র পদে বরণ করে নেবেন। ভোটারদের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে?

বিবিসি বাংলা এই তিন শহরের তিনজন সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে:

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে মোট পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

তাদের মধ্যে সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম. খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামানের পুত্র।

রাজশাহী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মি. খায়রুজ্জামান ২০০৮-এর নির্বাচনে মেয়র হয়েছিলেন।

তার প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক বড় দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির শহর কমিটির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

তিনি ২০০৮-এ মি. খায়রুজ্জামানের কাছে হারলেও ২০১৩ সালের নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন।

একই পদের স্বতন্ত্র প্রার্থী মুরাদ মোর্শেদ। তিনি গণ সংহতি আন্দোলনের রাজশাহী জেলার সমন্বয়ক।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাবিবুর রহমানও মেয়র পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এছাড়াও সিটি কর্পোরেশনের ৩০টি সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৬০ জন ও ১০টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ৫২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

গত ১০ই জুলাই থেকে টানা ১৮ দিনের প্রচারণার পুরো সময় জুড়ে তর্ক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করেছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই প্রার্থী।

রাজশাহীতে ভোটারের সাথে কোলাকুলিতে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী। খায়রুজ্জামান লিটনের নির্বাচনী ঘোষণা ছিল ‘চলো আবার বদলে দেই রাজশাহী’।

প্রচারণাতে তিনি স্থানীয় উন্নয়নকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।

নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি বাসা-বাড়ির কর কমানো, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ দেয়া এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অন্যদিকে, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল স্থানীয় উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয় নানা বিষয়কে বড় করে দেখেছেন।

নির্বাচিত হলে তিনি কোটা সংস্কার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহযোগিতা করবেন বলেছেন।

রাজশাহী থেকে জেলবন্দী বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের সূচনা করার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি।

প্রার্থীরা সকলেই সিটি কর্পোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে নাগরিক মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলও নির্বাচনী আলোচনায় স্থান পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ কোন্দল কাটিয়ে সব পর্যায়ের নেতা কর্মীকে প্রচারের মাঠে নামাতে সমর্থ হলেও, বিএনপির ক্ষেত্রে ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে।

বড় দুই দল প্রচারণার সময় অভিযোগ-পাল্টা-অভিযোগে একে অপরকে জর্জরিত করেছে।

সংখ্যায় কম হলেও বড় ধরনের অভিযোগগুলো এসেছে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের পক্ষ থেকে।

তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরকারি দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ এনেছেন।

মি. হোসেন বলছেন, সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে একতরফা প্রচারণা চলেছে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য ও অন্য সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা লিটনের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং পুলিশ নির্বিচারে তার নির্বাচনী এজেন্ট ও প্রচার কর্মীদের গ্রেফতার করে প্রচারাভিযান বাধাগ্রস্ত করেছে।

এসব অভিযোগে নির্বাচন কমিশন কোন পদক্ষেপ নেয়নি বলে তিনি জানান।

শহরের পাঠানপাড়ার আবুল বাশার জানালেন, তার ভাই শাহরিয়ার খন্দকার নয়ন বিএনপি প্রার্থী বুলবুলের পোলিং এজেন্ট হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, নির্বাচনের দিন তার দায়িত্ব পালন করার কথা।

কিন্তু সোমবার রাতে সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। মি. বাশার বলেন, “পরের দিন কোথাও তাকে খুঁজে পাইনি, একদিন পর জানতে পাই, আমার ভাই পাবনা জেলে রয়েছে।”

খায়রুজ্জামান লিটন এক আলোচনায় বলেছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন অতীতে বিএনপি সরকারের আমলের নির্বাচন কমিশনের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। তিনি বিএনপির সময়ের ১৫ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও এমএ সাঈদের নির্বাচন কমিশনের কথা উল্লেখ করেন।
রিটার্নিং অফিসার সৈয়দ আমিরুল ইসলাম বলেছেন, তারা দু’পক্ষ থেকেই অভিযোগ পেয়েছেন। মোট ৮২ টি অভিযোগের মধ্যে ৫০-এর বেশি অভিযোগ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর দেয়া, বিএনপি প্রার্থীর দেয়া অভিযোগ ২১টি।

তিনি জানান, দু’পক্ষই আচরণবিধি ভেঙ্গেছেন এবং তাদেরকে অন্তত দু’বার করে সতর্ক করা হয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনী কর্মীদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবী, তারা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সাত জনকে গ্রেফতার করেছেন। এর বাইরে বিএনপির কর্মী গ্রেফতারের কোন তথ্য তাদের কাছে নেই।

আরএমপির কমিশনার একেএম হাফিজ আখতার বলেন, বিএনপির প্রচারণায় বোমা হামলার একটি ঘটনায় পুলিশ রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদককে গ্রেফতার করেছে, যিনি স্বীকার করেছেন যে ভোটারদের সহানুভূতি অর্জনের জন্য বিএনপির নিজেদের লোকেরাই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যকার কথোপকথনের একটি অডিও টেপ পুলিশের হাতে এসেছে।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বিএনপি নেতার গ্রেফতার পুলিশের ষড়যন্ত্র।

বিএনপি প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট তোফাজ্জল হোসেন বলেন, বোমা বিস্ফোরণের একটি ভিডিও ফুটেজ পুলিশ জব্দ করেছে যেখানে দেখা গেছে বিস্ফোরণের পর সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাচ্ছে। “পুলিশ ঐ ব্যক্তিদের গ্রেফতার না করে বিএনপি নেতাদের গ্রেফতার করছে।”
একটি নির্বাচনী আলোচনায় খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ২০১৩ সালে বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হয়ে সরকার পতনের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা ও পুলিশ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে যান। তিনি নগর উন্নয়নে কোন নজরই দেননি। যার ফলে নগরবাসীকে গত পাঁচ বছর ধরে ভাঙ্গাচোরা রাস্তা, এলোমেলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অভাবে ভুগতে হয়।

এই অভিযোগের ব্যাপারে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, তাকে মেয়র হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়নি। পাঁচ বছরের মধ্যে আড়াই বছর তাকে বরখাস্ত করে রাখা হয়। “আমাকে হাত পা বেঁধে কুয়ার মধ্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, আমি কিভাবে কাজ করব।”

তিনি বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বিএনপি সরকার গঠন করবে ও সেসময় তিনি মেয়র থাকলে সরকারের কাছ থেকে সহজেই রাজশাহীর উন্নয়নের জন্য অর্থ যোগাড় করতে পারবেন।

এই পরিস্থিতিতে ভোটারদের অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

ভোটের দিন সব দলের সমর্থকরা রাস্তায় থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন শহরের টিকাপাড়ার ভোটার মনসুর রহমান। “প্রচারণা তো একতরফাই হল। ভোটের দিন অবস্থা বুঝে তবেই ভোট কেন্দ্রে যাব। নিরাপত্তার সামান্য কমতি দেখলে বাসাতেই থাকব,” বলছিলেন মি. রহমান।

তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিন লাখের বেশি ভোটার যাতে স্বচ্ছন্দে ভোট দিতে পারেন তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন ১৩৮টি ভোট কেন্দ্রের ১১৪টিকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এ ছাড়াও থাকছে বিচার বিভাগীয় ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দল, বিজিবি, র‍্যাব এবং আনসার বাহিনী।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন রয়েছে আশা-প্রত্যাশা আর শঙ্কা। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনটি দলীয় থাকবে নাকি ব্যক্তি প্রার্থীই মুখ্য হয়ে উঠবেন তা নিয়ে বিতর্ক চলছে।

তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় দুই দলে উত্তেজনা, পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে বেশ ভালোভাবেই।

আচরণবিধি লঙ্ঘন নিয়ে মেয়র প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নির্বাচনের শুরু থেকেই আছে।

বিশেষ করে বড় দুই দলের প্রার্থীর বাকযুদ্ধের পাশাপাশি চলছে পরস্পরের প্রতি বিষেদগার। এ অবস্থায় নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

এবার নির্বাচনে মেয়র পদে সাত জনের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত ছয়জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এরা হচ্ছেন: সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সদ্য-বিদায়ী মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সিপিবি-বাসদের প্রার্থী আবু জাফর, স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এহছানুল হক তাহের।

সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হলেও শেষ পর্যন্ত গত ১৯শে জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর থেকে তাঁকে নির্বাচনী মাঠে দেখা যায়নি।

এ অবস্থায় ব্যালট পেপারে তাঁর নাম ও প্রতীক থাকলেও মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছয় প্রার্থীর মধ্যে।

সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দলের মহানগর সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান একসময় ছিলেন পৌর চেয়ারম্যান এবং পরে দু’দুফায় মেয়র।

আর বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী সদ্য-বিদায়ী মেয়র। ২০১৩ সালের নির্বাচনে মি. চৌধুরী চমক দেখিয়ে নগর সংস্থায় মি. কামরানের ১৭ বছরের সাম্রাজ্য তছনছ করে দিয়েছিলেন।

তাই এবার মি. কামরানকে নৌকার মাঝি করে পাঁচ বছর আগে হাতছাড়া হওয়া নগর ভবনে আবারো নিজেদের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চায় আওয়ামী লীগ।

আর বিএনপি চায় নগর ভবনের কর্তৃত্ব নিজের প্রার্থীর হাতেই ধরে রাখতে। যে কারণে বড় দুই দলের কাছেই মেয়র পদে নির্বাচন অনেকটা মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

সিলেটে নগর উন্নয়নের বিষয়গুলোই ভোটের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে।

এক্ষেত্রে যানজট, ফুটপাতে হকারদের অবৈধ দখল, পানীয় জলের সঙ্কট, নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ছড়া ও খাল অবৈধভাবে দখল এবং জলাবদ্ধতা এই পাঁচটি বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। যানজট নিরসন এবং ফুটপাতের দখল উচ্ছেদে সদ্য-বিদায়ী মেয়র বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিলেও তেমন সুফল পাননি।

গত ৫ই জুন হকার উচ্ছেদ করতে গেলে হকাররা নগর ভবন ঘেরাও করে হামলা চালায়। ছড়া ও খাল উদ্ধার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছুটা সুফল পাওয়া গেলেও এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। নির্বাচনে এই ইস্যুগুলো বড় হয়ে দেখা দেবে বলে অনেকেই মনে করছেন।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, “দলীয়ভাবে নির্বাচন হলেও মূলত স্থানীয় উন্নয়নের বিষয়টি ভোটাররা গুরুত্ব দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত এসব বিষয়ে যে প্রার্থীর প্রতি ভোটাররা আস্থা রাখতে পারবেন তার প্রতিই ঝুঁকে পড়বেন।

এবারের নির্বাচনে নানা সমীকরণ কাজ করছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই একাধিক প্রার্থী নিয়ে বেশ বেকায়দায় ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সব মিলিয়ে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারলেও বিএনপিতে চলে নানা টানাপড়েন।

মনোনয়ন দাখিলের মাত্র একদিন আগে বিএনপি প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও বিদ্রোহ ঠেকাতে পারেনি।

দলের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। অন্যদিকে ২০দলীয় জোটের শরিক জামায়াতও মেয়র পদে নিজেদের প্রার্থী দেয়।

শেষ রক্ষার চেষ্টায় নিজের ঘর সামলাতে পারলেও দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতকে কোনোভাবেই বশে আনতে পারেনি বিএনপি।

এ অবস্থায় জোটের শরিক জামায়াতের ভোট এবার বিএনপি প্রার্থীর বাক্সে যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হলেও ভেতরে ভেতরে দলে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কোন বিরোধিতা দেখা যাচ্ছে না তবুও দলের নেতাকর্মীরা ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ নিয়ে শঙ্কায় আছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর আওয়ামী লীগের একজন নেতা জানান, “এখন সিটি নির্বাচন। সামনে জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু সিলেটে সংগঠন শক্তিশালী করার কোন উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। যার ফলে নেতাকর্মীরা অনেকটা বিমুখ। নগরের ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে অধিকাংশ ওয়ার্ডেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই।”

এর প্রভাব ভোটে পড়বে বলে ঐ নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বড় ভরসা তার দল এবং সরকার। দল ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে না পড়লে হিসাব-নিকেশ জটিল হতে পারে।

বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নিজের ব্যক্তি ইমেজ ভাল থাকলেও নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়।

আর দলের পুঁজির বাইরে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর বড় পুঁজি উন্নয়ন। পাঁচ বছরের জন্য মেয়র নির্বাচিত হলেও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলা এবং পরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা-চেষ্টা মামলায় আরিফুল হক প্রায় ২৭ মাস কারাগারে ছিলেন।

এরপরও দুই বছরে সিলেট নগরের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করেছেন তিনি। রাস্তাঘাট সম্প্রসারণ করেছেন, ছড়া-খাল উদ্ধার করেছেন এমনকি নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসনেও পদক্ষেপ নিয়েছেন।

বিরোধী দলের মেয়র হওয়া সত্ত্বেও আস্থা অর্জন করেছেন অর্থমন্ত্রীর। নগরের উন্নয়নের স্বার্থে অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে এক রিকশায় ঘুরেছেন মি. চৌধুরী। অর্থমন্ত্রীও তাকে উন্নয়ন বরাদ্দ দিয়েছেন অকৃপণ হাতে। তাঁর এসব উদ্যোগ কর্মকাণ্ড নগরবাসীর মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এ অবস্থায় ভোটাররা উন্নয়নের বিষয়টিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং সেক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন দলীয় না থেকে ব্যক্তি-পছন্দে রূপ নিতে পারে।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ১৬ বছরের পথ-পরিক্রমায় একজন প্রশাসকসহ তিনজন মেয়র কাজ করেছেন নগরীর উন্নয়নে ।

এবারের নির্বাচনে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বী। নগরবাসী ভাবছেন, কে আবার তাদের সেই সুন্দর পরিচ্ছন্ন নগরী ফিরিয়ে দিতে পারবেন। কে করতে পারবেন নগরীর উন্নয়ন।

বরিশালে দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি থেকে মো. মজিবর রহমান সরওয়ার।

আওয়ামী লীগ থেকে সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ, বাসদের মনীষা চক্রবর্তী , ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে ওবায়দুর রহমান মাহবুব, সিপিবির একে আজাদ, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) মো. ইকবাল হোসেন তাপস এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বশির আহমেদ ঝুনু।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন ২০০২ সালে গঠিত হওয়ার এক বছরের মাথায় মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি নেতা মো.মজিবর রহমান সরওয়ার। তিনি জলাবদ্ধতা দূর করতে খাল খনন, রাস্তা প্রশস্ত করার কাজে হাতে নিয়েছিলেন।

এবারের নির্বাচনেও নগরীর উন্নয়নের জন্য ইশতেহার ঘোষণা করে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন মেয়র প্রার্থীরা।

আওয়ামী লীগের মেয়র-প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ কোন ইশতেহার ঘোষণা করেননি। তিনি বলেন, “ইশতেহার দিয়ে নাগরিকদের সাথে প্রতারণা করতে চাইনা। নাগরিকদের চাওয়া পাওয়া পূরণ করার চেষ্টা করবো।”

বিএনপির মো. মজিবর রহমান সরওয়ার ২৮-দফা ইশতেহার দিয়ে নগর উন্নয়নের মহা পরিকল্পনার কথা বলেছেন।

তবে এবারের নির্বাচনে আলাদা করে দৃষ্টি কেড়েছেন একমাত্র নারী মেয়র-প্রার্থী বাসদের মনীষা চক্রবর্তী ।

পেশায় চিকিৎসক এই তরুণ প্রার্থী সরকারি চাকুরি ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে নেমেছেন। মিজ চক্রবর্তী বলেছেন, মেয়র হতে পারলে নগরভবনকে তিনি দুর্নীতি, লুঠপাট মুক্ত করবেন। তার ১৪-দফা ইশতেহারে নারীদের জন্য রয়েছে ভিন্ন কর্মসূচি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর প্রার্থী ওবায়দুর রহমান মাহবুব, জাতীয় পাটির (এরশাদ) প্রার্থী মো. ইকবাল হোসেন তাপসও নিজেদের ইশতেহার প্রকাশ করেছেন।

ঘোষিত ইশতেহারে প্রায় সব প্রার্থী নাগরিক সেবার পাশাপাশি তাদের এখতিয়ারের বাইরে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নদী খনন, মাদকমুক্ত নগরী গড়ার অঙ্গীকার করেছেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..