বড়দের অসতর্কতায় বলি শিশুরা!

  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯
  • ৬ বার পঠিত

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিপীড়ন-ধর্ষণ-হত্যার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় পরিস্থিতি। বিশেষ করে বিভিন্ন স্থানে স্কুল ও মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষকের ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারও হয়েছে কয়েকজন। এর মধ্যেই পুরান ঢাকায় আরেক শিশুকে ধর্ষণ করার পর গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি কোথাও কোথাও এক শ্রেণির পরিবারের কাছেই অনিরাপদ হয়ে পড়ছে শিশুরা। নিজ ঘর বা পরিবারেও শিশুদের প্রতি ঘটছে এমন ধরনের পৈশাচিক ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা এমন ঘটনাকে একদিকে দেশের একটি শ্রেণির মানুষের নৈতিক, মানসিক ও সামাজিক চরম অবক্ষয় বলে মনে করছেন, অন্যদিকে দেশের শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা বিবেচনা করছেন।

যারা এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়নি তারাও প্রতি মুহূর্তে মানসিক শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা নিয়ে বেড়ে উঠছে বলে বলছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সময়মতো সুবিচারের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে নারীর প্রতি সম্মানবোধ বৃদ্ধির সচেতনতা বাড়াতে আরো কাজ করার তাগিদ দিয়েছেন অনেকে।

মনোবিদ অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যেমন অনেক দিক থেকে উন্নতি-উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি, তেমনি সামগ্রিকভাবে একটি মানসিক-সামাজিক অধপতন ও অবক্ষয়ের মধ্য দিয়েও যাচ্ছি। পরিবার-শিক্ষা-রাজনীতি-আদর্শ সব জায়গাতেই এর কালো ছায়া আছে। সবাই যখন অর্থবিত্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে তখন এর আড়াল দিয়ে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় বড় হয়ে ওঠে। সে অবক্ষয় এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে অসুস্থ যৌনতা ও মানসিক বিকারগ্রস্ততাও জাগ্রত করে। নারীর প্রতি সম্মানের জায়গাকে তারা মোটেই মূল্যবোধ দিয়ে দেখতে পারে না; যার অন্যতম বলি হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপ্রিয় হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে অবাধে স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করার সক্ষমতা হয়নি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাবও বড়ভাবেই পড়ছে। আবার অনেকে যৌনশিক্ষার বিষয়কে উৎসাহিত করলেও এর নেতিবাচক দিক নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়েছে। চীন-থাইল্যান্ডের মতো উন্মুক্ত সংস্কৃতির দেশই এখন রক্ষণশীলতার পথ খুঁজতে শুরু করেছে নতুন প্রজন্মকে রক্ষার জন্য। ফলে আগে থেকেই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়া মানুষের কাছে অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যৌন অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধে উৎসাহ জোগাতে পারে।’

নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে শিশুদের হত্যা ও নির্যাতনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৮৯৫টি শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২০৩টি শিশু খুন হয়েছে।

ওই তথ্য অনুসারে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারী ও শিশুদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সের নিচের শিশু-কিশোরীরাই বেশি। যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০২ জনের বয়স সাত থেকে ১২ বছর, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়স ৯৭ জনের, অনূর্ধ্ব ছয় বছর বয়স ৫৯ জনের। আর বড়দের মধ্যে ধর্ষণের শিকার ১৯ থেকে ২৪ বছর ২৭ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছরের ১৬ জন এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সীর সংখ্যা ১৭। যদিও এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ৩১২ জনের বয়স যেমন প্রকাশ করা হয়নি আবার মোট ৬৩০টি ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৪৩২টি।

ধর্ষণের পর যাদের খুন করা হয়েছে তাদের মধ্যেও শিশুরাই বেশি। বিশেষ করে, ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে অনূর্ধ্ব ছয় বছর বয়সের পাঁচজন, সাত থেকে ১২ বছর বয়সের সাতজন এবং ১৩ থেকে ১৮ বছরের ৯ শিশুকে। অন্যদিকে ধর্ষণের পর খুন হওয়া বড়দের মধ্যে ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সের দুজন, ২৫ থেকে ৩০ বছরের দুজন এবং ৩০ বছরের ওপরের বয়স চারজনের।

এদিকে আসকের প্রতিবেদন অনুসারে ধর্ষণ ও অন্যান্য কারণে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অনূর্ধ্ব ছয় বছর বয়সী শিশু নিহত হয়েছে ৪১ জন, সাত থেকে ১২ বছর বয়সের খুন হয়েছে ৩৮ জন এবং ৯৪ জন খুন হওয়া শিশুর বয়স ১৩ থেকে ১৮ বছর। অবশ্য এর বাইরে ৩৮ শিশুর হত্যাকে রহস্যজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যসূত্র থেকে আসক এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে জানান ওই প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র উপপরিচালক নিনা গোস্বামী।

উপপরিচালক নিনা বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণে দেখতে পেয়েছি, শিশুরা ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। একদিকে তারা শিক্ষক-আত্মীয়স্বজন বা দুর্বৃত্তের ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, অন্যদিকে মা-বাবা বা পরিবারের অন্যদের কলহের শিকার হয়ে খুন হচ্ছে। অনেক ঘটনার মামলাও হচ্ছে না আবার মামলা হলেও সঠিকভাবে বিচারকাজ এগোচ্ছে না। এমনকি বড়দের মতো শিশুরাও পরিস্থিতির মুখে পড়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে। গত ছয় মাসে ৪০ শিশু আত্মহত্যা করেছে, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ ছাড়া বিভিন্ন ঘটনার শিকার ১৭ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, নিখোঁজের পর উদ্ধার হয়েছে এক শিশুর লাশ।’

সেভ দ্য চিলড্রেনের পরিচালক ডা. ইশতিয়াক মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এককথায় বলতে গেলে এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পারছি আমরা। তবে আমার মনে হয়, শিশুর প্রতি সহিংসতা যতটা বাড়ছে, তার সঙ্গে ঘটনার ভিকটিম বা ভিকটিমের স্বজনদের পক্ষ থেকে বিষয়টি চেপে না রেখে প্রকাশ করার সাহস ও সচেতনতা অনেকটা বাড়ছে। ফলে ঘটনা আগের তুলনায় বেশি প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তথ্য প্রকাশ ও মানুষের প্রতিবাদের এই স্পৃহাকে ইতিবাচকভাবে দেখে অপরাধ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারের আরো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’

এ ক্ষেত্রে ড. মেহতাব খানম গণমাধ্যমের আরো দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে বলেন, ভিকটিমরা আগের চেয়ে সচেতন হয়েছে ঘটনা জানানোর ক্ষেত্রে। সে জন্যই হয়তো গণমাধ্যম এগুলো জানতে পারছে। তাই বলে ধর্ষণের ঘটনায় যেভাবে ভিকটিমের ছবি-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে কিন্তু হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা নীতি-নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না, বরং গণমাধ্যমের অসতর্ক আচরণ ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের পাশবিক ঘটনার বিস্তারে প্রভাব রাখতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন নজিরও কিন্তু আছে।

ডা. ইশতিয়াক মান্নান বলেন, স্কুল-কলেজে নারীর প্রতি পুরুষের মানসিক আচরণ, সম্মানবোধের বিষয়ে আরো বেশি সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা প্রয়োজন। পরিবার থেকেও ছেলেদের এ শিক্ষা দেওয়ার জন্য মা-বাবাকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বলেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলোতে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে উঠছে। যারা এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়নি তারাও প্রতি মুহূর্তে মানসিকভাবে শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা নিয়ে বেড়ে উঠছে।

সূত্র: কালের কন্ঠ

 

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..