সংবাদ শিরোনাম :
ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০০২ ব্যাচের বন্ধুদের মিলন মেলা লালমনিরহাটে স্বেচ্ছাসেবক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রান বিতরণ রায়পুরায় নদীগর্ভে বিলিন পরিবারদের মাঝে আ.লীগ নেতা কাওছারের ত্রান সহযোগিতা রায়পুরায় জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভা বসুন্ধরা গ্রুপের অর্থায়নে স্বেচ্ছাসেবক ফাউন্ডেশনের এান বিতরণ নরসিংদীতে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কল্যান সংস্থার ঈদ পুনর্মিলনী আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান নেতা খোরশেদ আলম সুরুজের ২৬ তম মৃত্যুবার্ষিকী কাল অশ্রুশিক্ত শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় সাবেক এমপি এটিএম আলমগীরের চির বিদায় নরসিংদীতে অস্ত্র ও গুলিসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহ পরাণ গ্রেপ্তার নরসিংদীতে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষনায় সমালোচনার ঝড়, বঞ্চিতদের ক্ষোভ

বর্তমান রাজনৈতিক লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি কতটুকু প্রয়োজন ?

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৯

 

 

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রদের, বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা সবার জানা। ছাত্র রাজনীতির এই গৌরবের ধারা স্বাধীন বাংলাদেশেও ছিল। কিন্তু এখন সেখানে উলটো হাওয়া। যতদ‚র জানা যায়, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজনীতিতে ছাত্র রাজনীতি যোগ করে নতুন মাত্রা। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছাত্রদের সক্রিয় রাজনীতিতে প‚র্ণতা পায় বিশ শতকে। তবে জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্রদের মোটামুটি অংশগ্রহণ থাকলেও ১৯২৮ সালে আগে বাঙালি ছাত্রদের কোনো নিজস্ব সংগঠন ছিল না। তখন কংগ্রেসের উদ্যোগে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি নামে ছাত্রদের একটি সংগঠন গঠিত হয়। তারই ধারাবহিকতায় ১৯৩০ সালের ১২ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম ছাত্রদের একটি সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদুল­াহকে একটি মুসলিম ছাত্র সমিতি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ১৯৩২ সালে নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ৷

ছাত্রত্ব শব্দটির সাথে বই-খাতা কিংবা কলমের যতটা স¤পর্ক থাকা উচিত ছিল ঠিক ততোটা স¤পর্ক নেই; শুধু ছাত্রের সাথে রাজনীতি শব্দটি যোগ হওয়ার কারণে। যে সময়টাতে ছাত্রদের কলম দুর্বার হওয়ার কথা ঠিক সেই সময়টাতে যখন ছাত্রের হাতে অস্ত্র গর্জন করে ওঠে তখন জাতির ভবিষ্যৎ কোনদিকে গড়াচ্ছে তা অনুমান করতে খুব বেশি পন্ডিত হওয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশে এখন ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। অথচ এ দেশেই রয়েছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবময় অতীত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ‘৬৯-এর গণআন্দোলন, ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন জাতীয় আন্দোলনে ছাত্রসমাজ গৌরবময় ভ‚মিকা রেখেছে। কিন্তু সে অবস্থা এখন আর নেই। স্বাধীন দেশে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। এখন ছাত্ররা দেশের স্বার্থের কথা ভাবে না। ভাবে নিজেদের স্বার্থের কথা। রাজনীতিতে তাদের যে আদর্শ ছিল তা আজ ভ‚লুণ্ঠিত। স্বার্থ যেখানে মুখ্য, সংঘাত সেখানে অনিবার্য। ছাত্র সংগঠনগুলো শুধু যে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে থাকে তা নয়, সংগঠনের অভ্যন্তরেও সংঘাত দানা বেঁধে ওঠে-স্বার্থে সামান্য আঘাত লাগলেই। ছাত্র সংগঠনগুলো অতিমাত্রায় দলীয় রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়ায় তাদের মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে। সংগঠনগুলো সামান্য কারণেই প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হচ্ছে। অনেক মেধাবী ছাত্রের জীবন এভাবে অকালে ঝরে পড়ছে সংঘাতের কারণে।

অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিঘিœত হচ্ছে লেখাপড়ার স্বাভাবিক পরিবেশ। ভিন্নমতের ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার দ্ব›দ্ব, নিজেদের মধ্যে কর্তৃত্ব-প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষ, টেন্ডারবাঁজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, শিক্ষকদের লাঞ্ছিতকরণ, খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষভাবে দিন দিন ছাত্রদের একাংশ জড়িয়ে যাচ্ছে। এদের সংখ্যা কম হলেও এদের কর্তৃত্বের কারণে সবাই তটস্থ থাকতে বাধ্য । কেননা এদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বহুমুখী ক্ষমতা রয়েছে। যে ছাত্রনেতাদের সকল ছাত্রদের অধিকার রক্ষা করা দায়িত্ব সেই তারাই যখন নিজ কিংবা দলীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে সকল শিক্ষার্থীর অধিকার কেড়ে নেয় তখন সাধারণ ছাত্রদের ক্ষতির পরিমাণ কোন মানদন্ডেই হিসাব করা যায় না। ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িতদের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যকার দ্ব›েদ্ব সৃষ্ট সমস্যা যখন প্রকট হয়, ছাত্র নিহত হয়, তখন কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই সে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। এ দেশের উচ্চশিক্ষার সাথে সেশনজট শব্দটি ওতপ্রতোভাবে মিশে গেছে তার ওপরে আবার ছাত্ররাজনীতিকদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা সাধারণ ছাত্রদের শিক্ষাজীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। শুধু ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িতে কিছু ছাত্রের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের কারণে এদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন সময় মাসের পর মাস বন্ধ ছিল। বহু কলেজের ক্যা¤পাস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে শিক্ষকদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পরিবহন ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়া হয়েছে। চাঁদা না দেয়ার কারণে কিংবা দলীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সাধারণ ছাত্রদের হল থেকে বের করে দেয়া, পিটিয়ে আহত করে হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য করাসহ বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। ছাত্রনেতা যখন পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি তখন তারা শিক্ষকদের আল্টিমেটাম দিয়েছে পাস করিয়ে দেয়ার জন্য কিন্তু শিক্ষক যখন তাদের নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি তখন তারা ভাংচুর চালিয়ে শিক্ষার পরিবেশকে ভীতিকর করেছে। কিছু উগ্র ছাত্ররাজনীতিকের কারণে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন প্রায়ই হুমকির মুখে পড়ে। বিভিন্ন সময় এদের দ্বারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্ট অচলাবস্থায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে চরম ক্ষতি ডেকে আনে। যার ফলে কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শেষ হতে না হতেই তাদের চাকরির তালাশের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ছাত্ররাজনীতির বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে এমন কোন মাস অতিক্রান্ত হয় না যে মাসে শিক্ষাঙ্গনে পৃথক মতাদর্শী কিংবা একই আদর্শের বিভিন্ন গ্রæপের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে দুএকজন ছাত্র কিংবা সাধারণ মানুষ প্রাণ না হারায়। বর্তমান সময় ছাত্ররাজনীতি জাতিকে আর কিছু না হোক অন্তত লাশ উপহার দিতে দিচ্ছে! কার্যত ছাত্ররাজনীতিকদের এ সকল কর্মকান্ডের সমালোচনা করার মতো ক্ষমতা কিংবা সাহস কারো আছে কিনা সন্দেহ। সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মকান্ডে নাখোশ হয়ে যখন খোদ প্রধানমন্ত্রী সে সংগঠনের প্রধানের পথ থেকে পদত্যাগ করেন তখন জাতির আশার শেষ প্রদীপটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না। দেশ পরিচালনার প্রধানব্যক্তি যখন স্বীয় দলের ছাত্রসংগঠনের অন্যায় কাজের লাঘাম টানার চেষ্টা না করে রাগ-ক্ষোভে পদত্যাগ করেন তখন সরকারের চেয়েও তারা বেশি ক্ষমতাধর প্রমাণিত হয়। দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল টিকে আছে ম‚লত তাদের ছাত্র সংগঠনের ওপর নির্ভর হয়ে। কাজেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা তাদের স্বার্থেই দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলোর অনেক অন্যায় কর্মকান্ড দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যায়। কেউ কেউ মুখে বড় বড় বুলি আওড়ালেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কখনো কোন গুরুত্বপ‚র্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যা দেখে অন্যরা ভীত হয়; তেমন কোন দৃষ্টান্ত আদৌ আছে কি? এড়িয়ে যাওয়ার এমন মানসিকতা ছাত্ররাজনীতিক ও সংগঠনগুলোকে আরও নেতিবাচক পথে অপ্রতিরোধ্য হতে উৎসাহী করেছে। আবার কোথাও কোথাও ক্ষমতাধরদের কেউ কেউ ছাত্রনেতা-কর্মীদের তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করছে। কলম যাদের হাতিয়ার হওয়ার কথা তাদের হাতে অস্ত্র তো আর আকাশ থেকে অবতারিত হচ্ছে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা যেখানেই ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয় সেখানেই বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া চলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ রহমান হলের ৪০৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন আবু বকর। সেদিন ওই হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রæপের সংঘর্ষ ঘটে। এরপর পুলিশ আসে। টিয়ারশেলের আঘাতে মারা যান রাজনীতি থেকে দ‚রে থাকা বকর। ঘটনার আট বছর পরেও জড়িত কারও শাস্তি হয়নি। স্বাধীনতার পর গত চার দশকে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দেড়শ’ ছাত্র প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছেন হাজার, গত চার দশকে দেশের চারটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন সব মিলিয়ে ১২৯ জন ছাত্র৷ এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয়জন ছাত্র মারা যান ৷ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দেখা গেছে, এই সরকারের দুই মেয়াদে ছাত্রলীগের সঙ্গে প্রতিপক্ষ বা নিজেদের মধ্যে প্রায় ৫০০ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ৷ এসব সংঘর্ষে মোট ৭১ জন মারা যান ৷ এর মধ্যে ৫৫ জনই নিহত হন নিজেদের কোন্দলে ৷ বিএনপি আমলেও একইভাবে নিজেদের মধ্যে কোন্দলে জড়িয়েছিল ছাত্রদল। ছাত্রদলের মধ্যে টেন্ডারবাজিতে পড়ে বুয়েট ছাত্রী সনির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এখনো দেশবাসী ভুলে যায়নি।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স স্টাডিজ ২০১২ সালে ছয় হাজার ৫০০ যুবকের ওপর একটি জরিপ করে৷ তাতে দেখা যায়, ৮০ শতাংশের অধিক যুবক ছাত্ররাজনীতি স¤পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করেন৷ কিন্তু বায়ান্ন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে ছাত্ররাজনীতি আলোকবর্তিকা হয়ে জাতিকে পথ দেখিয়েছে, সেই ছাত্ররাজনীতি স¤পর্কে ৮০ শতাংশের বেশিসংখ্যক যুবক কেন বিরূপ ধারণা পোষণ করেন, সেটি খুজে বের করে সমাধান করা উচিত৷ কারণ, বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির অতীতটা যে অনেক গৌরবের।

প্রকৃতপক্ষে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ভবিষ্যত রাজনীতিবিদ তৈরির একমাত্র উপায় হলো ছাত্ররাজনীতি। কাজেই দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্যই ছাত্ররাজনীতিকে ঠিক পথে পরিচালিত করা এবং সৎ, যোগ্য ও মেধাবীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। দুঃখজনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের অপরাজনীতি, অপশাসন আর ব্যাপক দুর্নীতির প্রভাবে দেশের ছাত্ররাজনীতিও মারাত্মকভাবে কলুষিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এই ছাত্ররাজনীতি ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে কোনো ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। জাতীয় রাজনীতি যেভাবে দিন দিন দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলছে, তেমনি ছাত্ররাজনীতির প্রতিও ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের তেমন আগ্রহ নেই। অনেক ক্ষেত্রে ছাত্রনেতাদের দ্বারাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা নানাভাবে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হচ্ছে। ছাত্রনেতারাই টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত হচ্ছে। এছাড়াও বর্তমানে ছাত্রনেতাদের অনেকেই শুধু মাদকাসক্তই নয়, বরং মাদক ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে। বর্তমানে ছাত্রনেতা হতে আর নীতি, আদর্শ, সততা বা রাজনীতি চর্চার প্রয়োজন হয় না, বরং বিপুল অর্থের বিনিময়ে সহজেই যে কোনো দলের বা অঙ্গ সংগঠনের নেতা হওয়া যায়! তাই জাতীয় স্বার্থবিরোধী যে কোনো অন্যায়, অবিচার, অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বর্তমান ছাত্ররাজনীতি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের চিন্তা না করে বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ এলাকার উন্নয়নম‚লক কাজ, চাকরিতে নিয়োগ-বদলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিকরণসহ বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক কাজে যুক্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় মেধাবী ও দেশপ্রেমিক শিক্ষার্থীরা এখন আর ছাত্ররাজনীতিতে আসতে চায় না। যে দেশের ছাত্ররাজনীতি একসময় ছিল গৌরবের, সেই দেশের ছাত্ররাজনীতি যখন সংঘর্ষ, দলীয় কোন্দল, টেন্ডারবাজি, সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, শিক্ষক লাঞ্ছিতকরণ, বোমাবাজি, ইভ টিজিং, দখলদারিত্বের হয়ে ওঠে, তখন তো প্রশ্ন উঠবেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সাধারণ মানুষের মতো পত্রিকা কিংবা টিভির পর্দায় সেগুলো দেখে তাদের দায়িত্ব শেষ করে ! সে অস্ত্রের আঘাত থেকে প্রতিপক্ষ যেমন রক্ষা পায় না তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যা¤পাসে খেলতে আসা ছোট্ট ছেলেটিরও বুক ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যায়ের গহীন জঙ্গলে ছাত্র-শিক্ষক মিলে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ পর্ব দেখে এদেশের মানুষ কলমের দাপটের অনুপস্থিতি দারুণভাবে উপলব্ধি করে। কেননা তারা বিস্মৃত হয়নি, এইচ এম এরশাদ সে সকল কারণে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন তার মধ্যে প্রধান কারণ ছিল ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ। আজ সবার কাছে ক্ষমতার মসনদ প্রাধান্য পাচ্ছে। কাজেই এক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন নিয়ে কারো খুব বেশি মাথা ব্যথা আছে বলে লক্ষণীয় নয়। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয় বরং ছাত্ররাজনীতিকরা যেন আদর্শবান হয়ে দল-মতের ওপর সত্যকে, শিক্ষার আলোকে স্থান দিতে পারে অন্তত সে নিশ্চয়তাটুকু তো জাতি দাবি করতেই পারে।

ছাত্ররাজনীতির সংস্কার সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি কেননা ছাত্র বয়সে যদি কারো মধ্যে দুর্নীতি প্রবেশ করে এবং সে কালক্রমে জাতির কর্ণধার হয় তবে রাষ্ট্রকে যে বিশাল মাশুল দিতে হবে তা রোধ করার সাধ্য কার? ছাত্র বয়সে লেখাপড়ার সাথে সাথে যদি আরও বিভিন্ন বিষয়ে যোগ্যতা অর্জন করে রাষ্ট্রের কল্যাণে ভ‚মিকা রাখা যায় তবে তার চেয়ে উত্তম কর্ম আর কি হতে পারে? কিন্তু ছাত্র যখন শিক্ষার সং¯পর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতা দখলের চেষ্টা, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনে দিওয়ানা, শিক্ষার্থীদের নিকট আতঙ্কের ও ছাত্রীদের নিরাপত্তার সংহারক হয় তখন তাদের সে কর্মকান্ডকে ছাত্রত্ব বিশেষণের সাথে মেলানো যায় না কিংবা উচিতও নয়। জাতির স্বার্থেই ছাত্ররাজনীতি টিকিয়ে রাখা দরকার কেননা জাতি এ স্তর থেকে ভবিষ্যতে তুখোড় রাজনৈতিক নেতা পাবে কিন্তু সেটা বর্তমান পদ্ধতিতে অবশ্যই সম্ভব নয়। বর্তমান ছাত্ররাজনীতিকদের ঘিরে যদি রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ স্বপ্ন সাজাতে চায় তবে সেটার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে এখনই নীতিগত বিবেচনায় ছাত্রসংগঠন ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে বৃহৎ সংস্কার আনতে হবে। টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, ধর্ষক কিংবা সন্ত্রাসী হিসেবে ছাত্রদেরকে দেখতে চাই না; ছাত্রনেতাদের তো নয়ই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় কমিটি গঠনের সময় প‚র্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ আবশ্যক। সাধারণ ছাত্রদের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তাদেরকে যদি ছাত্রদের নেতা মনোনীত করা হয় তাতে একদিকে যেমন সাধারণ ছাত্রদের স্বার্থ রক্ষা পাবে অন্যদিকে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। পকেট কমিটি, লবিংয়ের মাধ্যমে পদ প্রাপ্তদের অনৈতিক কর্মকান্ডের শুরু হয় ম‚লত তাদের উত্থান পর্ব থেকেই এবং দিন যত গড়ায় তাদের নীতি বিবর্জিত কর্মকান্ডের পরিসর তত বাড়তে থাকে। শুরুটা যাদের অনৈতিকভাবে হয় তারা নৈতিকতার সংজ্ঞায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না কিংবা সম্ভবও নয়।

কাজেই ছাত্রনেতা নির্ধারণ করতে হবে সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। ছাত্রনেতাদের দ্বারা দলীয় স্বার্থ রক্ষার নিশ্চয়তা দাবি করা যেতে পারে কিন্তু তাদের দ্বারা যদি কারো ব্যক্তি স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা হয় তবে সে কাজটি কোন অবস্থাতেই উত্তম ফল আনবে না। আমরা ছাত্ররাজনীতির সুদিন দেখতে চাই, যে দিনগুলোর ফসল এদেশের গর্বিত রাজনীতির রথী-মহারথীরা। মাত্র কয়েকজন কুখ্যাত ছাত্রের জন্য গোটা ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রসমাজ যেন কলুষিত না হয় সে দিকে নি®পলক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। একবেলা কিংবা একদিন ভুখা পেটে থাকা যায় কিন্তু বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এক মুহ‚র্ত কাটানো কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

ছাত্ররা রাষ্ট্রের স্তম্ভ। সে স্তম্ভ যদি নড়বড়ে হয় তবে রাষ্ট্রের অন্য সব কিছু ঝুঁকিতে থাকে। রাষ্ট্রকে ঝুঁকিমুক্ত এবং জাতিকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে পারে আজকের ছাত্রনেতারা। কেননা ছাত্রনেতাদের মহৎ আদর্শই সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে প্রবেশের মাধ্যমে তারা দেশ ও জাতি গঠনে উদ্ধুদ্ধ হবে। ছাত্র রাজনীতির সুফল পেতে করণীয় ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। গণতান্ত্রিক সংগ্রাম স‚চনা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন থেকে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ছাত্র-শিক্ষক সমাজের অগ্রগণ্য সব সময় বিবেচিত হয়েছে। যখনই দেশের গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হয়েছে তখনই বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন হয়ে উঠেছে আন্দোলনমুখর। ছাত্র রাজনীতি ও গণতন্ত্র চর্চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ‚মিকা অনুধাবন করতে হলে প্রথমেই আমাদের গণতন্ত্র স¤পর্কে জানতে হবে। গণতন্ত্র এক ধরনের ব্যবস্থা। বৈশিষ্ট্যপ‚র্ণ এক সমাজব্যবস্থা। সবার আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করে গণতন্ত্র। জনগণের জীবনে রচনা করে এক বলিষ্ঠ জীবনবোধ। রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করেনি। ফলে সৃষ্টি হয়েছে গণতন্ত্রহীনতা ও এক ধরনের শ‚ন্যতা। সেই শ‚ন্যতা গিয়ে পড়ছে সমাজের অপেক্ষাকৃত অগ্রসরমান ছাত্র রাজনীতির কেন্দ্রভ‚মি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ভ‚মিকা সু¯পষ্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজিফা তাসনিম খানম বলেন, ডাকসু নির্বাচনের আগে বলা হয়েছিল হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বৈধভাবে সিট পাবে।কিন্তু তিনি এখনো সিট পান নি।”এগুলো নিয়ে কেউ কথাও বলছে না।”হলে থাকার জন্য জোর করে রাজনীতি করানো হয়। মিছিলে যেতে বাধ্য করা হয়। কেন একজন শিক্ষার্থীকে পড়ালেখা বাদ দিয়ে জোর করে রাজনীতি করাতে হবে? প্রশ্ন করেন তাসনিম খানম।বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির বিশেষ অবদান রয়েছে।শিক্ষার্থী ইসরাত সুলতানা বলেন,বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের কেন্দ্র করে হয় না, হয় দলকে কেন্দ্র করে। তিনি বলেন,তাদের উদ্দেশ্য ক্ষমতা অর্জন করা। ছাত্রদের কথা তারা বলছে না। সুলতানা বলেন, একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হত আন্দোলনের স‚তিকাগার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও বিশেষ অবদান আছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ স¤পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সব ছাত্র সংগঠনই কমবেশি জাতীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। এদিকে শিক্ষার্থীদের বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্যা¤পাসে ছাত্র রাজনীতি পরিচালিত হতে হবে এ বিষয়ে সব ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কর্মধারা পরিচালনা করতে পারেনি বলে শিক্ষার্থীরা মনে করেন।

ছাত্রদের বয়সসীমা নির্ধারণ, প্রকৃত ছাত্রদের দিয়ে কমিটি গঠন, নিয়মিত কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি বদল হওয়াসহ শৃঙ্খলার মধ্যে ছাত্র রাজনীতিকে আনতে হবে। এখন যার দাপট বেশি সেই দাবি করেন তিনি সংগঠনের হর্তাকর্তা। নেতারা যদি সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটিতে আসতেন- তাহলে তিনি ভাবতেন, নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, এবছর খারাপ করলে পরের বছর কেউ ভোট দিবে না। তাহলে ছাত্র রাজনীতি ভারসাম্যের মধ্যে আসতো। যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে- আমাদেরকে সেদিকে দ্রæত অগ্রসর হতে হবে। ছাত্ররাই আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বিনির্মাণ করবে এবং ভবিষ্যত নেতৃত্ব দিবে- কাজেই একথা চিন্তা করে ছাত্র রাজনীতি করার জায়গা আমাদেরকেই করে দিতে হবে। দলাদলির বিষয় শুধু শিক্ষক এবং ছাত্রদের মাঝে নয়, পেশাজীবী সংগঠন এমনকি সংসদেও আছে। শুধু ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ফেরেস্তার মতো হবেন- বাকিরা যার যার মতো থাকবেন এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী আমরা অনেক কিছু দিতে পারছি না। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ছাত্র রাজনীতি অস্থিতিশীল হওয়ার পিছনে শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কথা সামনে আনতে হয়। শিক্ষার্থীদের বড় সমস্যা থাকার জায়গা নিয়ে দলাদলি-মারামারিসহ নানা বিশৃঙ্খল ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত থাকার জায়গা নেই। ছাত্রদের ক্যান্টিনে খাবারের নিন্মমান, লাইব্রেরিতে বইয়ের অপর্যাপ্ততা, ইন্টারনেট ব্যবহারসহ বহুবিধ সমস্যা রয়েছে। সুস্থ ছাত্র রাজনীতির জন্য এসব সমস্যার সমাধান এবং শিক্ষার্থীদেরকে সামাজিক কর্মকান্ড যেমন খেলাধুলা, চিত্তবিনোদন,সাংস্কৃতিক বিষয়ের সাথে স¤পৃক্ত করতে হবে। আর এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট দরকার। সারা বছরব্যাপী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য কর্মকান্ডে জড়িত রাখতে হবে। সব শিক্ষার্থী আবাসিক হলে আসন পাচ্ছে; থাকার জায়গার জন্য কারো লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি বা কোনো নেতার পিছনে ছুটতে হচ্ছে না- এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে ছাত্র রাজনীতিতে অনাকাঙ্খিত ঘটনা হ্রাস পাবে।

শিক্ষাখাতে আমাদের জিডিপির বরাদ্দ সর্বনিন্ম। আফ্রিকার অনেক দেশ এমনকি নেপাল-ভুটানের চেয়েও বরাদ্দ অনেক কম। ইউনেস্কোর ন্য‚নতম স্টান্ডার্ড অনুযায়ী শিক্ষাখাতে আমাদের বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। প্রতিবছর সামান্য করে বাড়ালেও শিক্ষাখাতের বড় চাহিদাগুলো প‚রণ হত। বরাদ্দ বাড়াতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা, গবেষণা ও আবাসিক সমস্যার সমাধান হত।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে কেউ ভাবে না । এক সময়ের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিশ্বের ১০০০ এর মধ্যেও স্থান নেই। যেখানে পাকিস্তানে ৭টি, ভারতে ৬৩টি রয়েছে ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরেবাংলা হলের ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সমাবেশে উপস্থিত ব্যক্তি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সন্ত্রাসের রাজনীতি তৈরি করেছে, তার ধারাবাহিকতায় আজ আবরারের হত্যাকান্ড।এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে নির্যাতন সেল আছে। সহকর্মী শিক্ষকদের যখন বলি উনারা বলেন, ডাহা মিথ্যা। আমি একটা হলের আবাসিক শিক্ষক। ছাত্রলীগ শিবির বলে একজনকে বের করে দিয়েছে। আমি কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, আমার নামে ৫৭ ধারায় মামলা করবে। আমি নাকি শিবির পালি।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আবরারের আগে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রলীগকে কে এই অধিকার দিয়েছে? ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে এর জবাব আছে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছাড়া কোনো কিছু ঘটে না!’ সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সাহিত্য স¤পাদক অরুণিমা তাসনিম বলেন, ‘মতপ্রকাশ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলে মা বাবার কাছ থেকে ৪০ টা ফোন আসে, বাবা স্ট্যাটাস দিস না। প্রতিটি হলে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করে রাখা হয়েছে। রাজনীতির নামে সন্ত্রাস চলছে জানিয়ে অদিতি মৃধা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্র রাজনীতি মানে হলো আদর্শ, সন্ত্রাস নয়। এখন আদর্শের বদলে সন্ত্রাস চলছে। যে কারণে আমি ঘর থেকে বের হয়ে চলে এসেছি। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ স¤পাদক অনিক রায় বলেন, ‘আবরার মারা গেছে, কিন্তু প্রতিরাতেই বুয়েটের কাউকে না কাউকে মেডিকেলে যেতে হয়।

নেতিবাচক ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস এবং যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় দেশের সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ছাত্রদের ভবিষ্যত নিয়ে সবাই শংকিত। আমরা জানি ছাত্র যার অভিধা, অধ্যয়ন তার তপস্যা। ভবিষ্যত জীবন সুন্দরভাবে গড়তে অধ্যয়নের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনই ছাত্রসমাজের প্রধান কাজ। কিন্তু বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হয়ে পড়েছে ছাত্রসমাজ। ছাত্র রাজনীতির যে ঐতিহ্য ছিল, তা আজ বিলীন হতে বসেছে। শিক্ষার্থীদের কাছে নিয়মানুবর্তিতা, শৃংখলা ও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ যেখানে কাক্সিক্ষত, সেখানে এর বিপরীত চিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে বেশি। ছাত্রজীবন হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের সময়। জ্ঞান বিজ্ঞান, ইতিহাস দর্শন নিয়ে ভাবতে হবে, অধ্যয়ন করতে হবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতা খুলে দেখতে পাই ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের চিত্র। অশুভ রাজনীতির হাতছানিতে নিজেদের ম‚ল্যবান সময় নষ্ট করে তারা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নষ্ট করছে। দলীয় রাজনীতির অশুভ স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিলে বিদ্যার্জন ব্যাহত হতে বাধ্য।এ অবস্থা আর কতদিন চলবে? যে ছাত্রসমাজের ওপর দেশ ও জাতির অনেক আশা আকাক্সক্ষা, যারা একদিন দেশের হাল ধরবে, তাদের মধ্যে এ হানাহানি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ না হলে দেশ কিভাবে উন্নত হবে? অনেক বাবা-মা কষ্ট করে তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠান। অনেক আশা ও স্বপ্ন থাকে তাদের মনে একদিন সন্তান মানুষ হয়ে তাদের ভাগ্যের উন্নতি ঘটাবে। কিন্তু সন্ত্রাসের কারণে যখন তাদের সন্তান লাশ হয়ে বাড়ি আসে, তখন সব স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্যই রাজনীতি এবং তা নিশ্চিত করতে হলে ছাত্রসমাজকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। দেশের শিক্ষা এবং শিক্ষাঙ্গনকে যে সব সমস্যা গ্রাস করেছে, তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ছাত্রদের রাজনীতি হবে শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের উন্নয়নে। ছাত্র সংগঠনগুলো চলবে তাদের নিজস্ব ধারায়। প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আদর্শগত কিছু অমিল থাকলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও স¤প্রীতির বন্ধন গড়ে তুলতে হবে, তাহলেই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বন্ধ হবে।

ছাত্র সংগঠনকে রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার ও শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এজন্য আগে সংগঠন চালাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা চাঁদা দিয়ে তাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠনকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে রক্ষা করতে পারে। অথবা সুষ্ঠু ছাত্র রাজনীতির চর্চায় সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রয়োজন। ছাত্র সংগঠনগুলোতে অছাত্রদের অনুপ্রবেশ রোধেও সচেতন হতে হবে। মোটকথা, শিক্ষার ম‚ল লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষাঙ্গনের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

গত তিন দশকে ছাত্র রাজনীতির চারিত্রিক ও গুণগত মান ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ওই সময়ে ছাত্র রাজনীতি তার চিরায়ত গণমুখী ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতামুখী দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে শেখে। তাই ছাত্র রাজনীতি আর আধিপত্যের স¤পর্ক একটি আরেকটির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে পড়ে। হারিয়ে যাওয়া ছাত্র রাজনীতির সর্বোচ্চ হাতিয়ার ছিল লেখাপড়া, বইখাতা, কাগজ-কলম, লাঠি। আর এখনকার ছাত্র রাজনীতির হাতিয়ার হল- মদ-গাঁজা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভাড়ায় শক্তি প্রদর্শন, মাদক বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, হলে সিট বাণিজ্য, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, কাটা রাইফেল, রিভলবার। এগুলোর পরে যদি সম্ভব হয় তাহলে কিছুটা লেখাপড়া আর নামকাওয়াস্তে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শুধু ছাত্রত্ব ধরে রাখার জন্য। তাও নাকি বর্তমান সময়ের ছাত্রনেতারা নিয়মিত করেন না। যথাসময়ে পাস করে বের হয়ে গেলে নাকি পদ-পদবিপ্রাপ্ত নেতা হওয়া যায় না। যারা বর্তমান ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে রয়েছে, তাদের প্রথমেই হতে হবে অপেক্ষাকৃত মেধাশ‚ন্য অথবা ভান করতে হবে কিছুই জানে না এমন, হতে হবে ভালো চামচা, থাকতে হবে পেশিশক্তি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির সামর্থ্য। এগুলো থাকলেই উপরের আশীর্বাদ পাওয়া যাবে এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা মিলবে। অবশ্য সম্মানজনক ব্যতিক্রম এখনো আছে! ছাত্রজীবন হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের সময়। জ্ঞান বিজ্ঞান, ইতিহাস দর্শন নিয়ে ভাবতে হবে, অধ্যয়ন করতে হবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতা খুলে দেখতে পাই ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের চিত্র। অশুভ রাজনীতির হাতছানিতে নিজেদের ম‚ল্যবান সময় নষ্ট করে তারা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নষ্ট করছে। দলীয় রাজনীতির অশুভ স্রোতে নিজেদের ভাসিয়ে দিলে বিদ্যার্জন ব্যাহত হতে বাধ্য।

বর্তমানে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে স¤পৃক্ত ছাত্রদের সাধারণ মানুষ আদর্শহীন, চরিত্রহীন, অর্থলোভী, মাস্তান, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজ, ম‚র্খ সর্বোপরি সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মানুষ বলে মনে করেন। কিন্তু এ কথাও সত্য এবং ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত, ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়েছে এবং আদর্শবান ছাত্র নেতারাই রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সেই ৫২, ৬২, ৬৯, ৭১, ৯০-এর ঐতিহ্য আজ অনুপস্থিত। ইচ্ছা করলেই ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, মুক্তিযুদ্ধের মতো আবেগী অনুষঙ্গ আজকে তৈরি করা যাবে না। বর্তমান সময়ের অনুষঙ্গ নতুন, ক্ষেত্রবিশেষ অতীতের চেয়ে গুরুত্বপ‚র্ণ। দুর্নীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মত প্রকাশে বাঁধা, বেকারত্ব, হত্যা, খুন, মাদক, ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের মতো ইস্যুগুলো এ দেশের স্বাধীনতার ম‚ল চেতনা তৈরির পথে প্রধান বাধা হিসেবে জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের সমাজের ওপর চেপে বসছে। এর থেকে মুক্তির জন্য আজকের ছাত্র সমাজ কেন ভ‚মিকা রাখতে পারছে না। এখনও তো সারা দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন সাধারণ ছাত্রদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ বন্ধ থাকার কারণেই ছাত্র রাজনীতি বর্তমান সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ভ‚মিকা রাখতে পারছে না। প্রতিযোগিতা ছাড়া কোনো ভালো কাজ সফলতার মুখ দেখে না। আওয়ামী লীগ আর বিএনপি যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সরকার ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছাত্র সংগঠন এমন অপ্রতিদ্ব›দ্বী ও একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে রাখে যেখানে প্রতিযোগিতার কোনো পরিবেশ থাকে না। যেখানে ভিন্নমত, ভিন্নদল থাকবে না, সেখানে মেধাবী নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে না।

ছাত্র রাজনীতিকে আবার দেশপ্রেমিক ও যোগ্য নেতৃত্বের স‚তিকাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে ক্যা¤পাস ও হলগুলোতে সব রাজনৈতিক মত ও দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিদ্ব›িদ্ব^তা নয়, প্রতিযোগিতার সংস্কৃতিই পারে ছাত্র রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের কাছে আবার গ্রহণযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে। রাতের আঁধার যতই গভীর হোক না কেন, সকালের স‚র্য অবশ্যই উদিত হবে। আমার বিশ্বাস নির্লোভ, আপসহীন ত্যাগের মানসিকতাস¤পন্ন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে অচিরেই ছাত্র রাজনীতি সুষ্ঠু ও সঠিক ধারায় ফিরে আসবে আর তখনই ছাত্র রাজনীতির প্রতি জনগণ আস্থাশীল হবে।

বুয়েটের ছাত্র আবরারের নৃশংস হত্যাকাÐ একদিকে বাক-স্বাধীনতার ওপর নিষ্ঠুরতম আঘাত ও অন্যদিকে ছাত্রসংগঠন তথা শিক্ষাঙ্গনের ওপর দুর্বৃত্তায়িত অসুস্থ রাজনৈতিক প্রভাবের নিষ্ঠুর পরিণতি উলে­খ করে অবিলম্বে বুয়েটসহ দেশের সকল ছাত্রসংগঠনসহ শিক্ষাঙ্গনকে স¤প‚র্ণ দলীয় রাজনীতিমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ।

অনেকে প্রশ্ন করছেন, পৃথিবীর কোথাও ছাত্র রাজনীতি নেই, তাহলে বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি কেন? আমাদের দেশে কি এর প্রয়োজনীয়তা আছে? এর ব্যাখ্যাটি ব্যাপকভাবে দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির একটি ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১, ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ এবং ১৯৯০ এর পরবর্তী ইতিহাস। একটি ছাত্র যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নেতা হতে চায় তার চিন্তা চেতনায় থাকতে হবে-আমি কিভাবে সবার চেয়ে চরিত্রবান ও মেধাবী ছাত্র হব,প্রতিদিন আমার কোন ক্লাস মিস হবে না ও আমি ছাত্রদের সাথে মিশে আমার যোগ্যতা তৈরি করবো,আমাকে নিয়মনীতি মেনে কে¤পাসে চলতে হবে,আমাকে যদি সত্যিকারের নেতা হতে হয় তাহলে আমি মানবো নিজেকে,নিজের বিবেক ও বিচার বুদ্ধিকে ও নিজের ভীতরের আসল মনুষ্যত্বকে।নেতা কোন বিশেষ মানুষ নয়,নেতা হলো অনেক মানুষের সমষ্টি। যে মানুষের মধ্যে অনেক মানুষ আসে সে হলো নেতা।কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো স্বাধীনতার পর আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের যায়গাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রুপ লাভ করেনি দেশীয় শক্রুদের জন্য। আজকের ছাত্র সমাজকে বিপথগামী করার জন্য দায়ী হলো আমাদের সরকারগুলো। ছাত্রদের হাতে অস্ত্র দিয়ে সরকারের লেজুড় বাহিনীতে পরিণত করেছে। তাদের গাড়ি বাড়ির লোভ দেখিয়ে পড়াশুনা থেকে দ‚রে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের বানিয়ে ফেলা হয়েছে দখলদার বাহিনীতে। তাদের ব্যবহার করছে ক্ষমতাভোগী সরকারের এমপি মন্ত্রীগণ। সমস্ত সন্ত্রাস বন্ধ করে ছাত্রদের গুনগত মান বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের আগামী সন্তানদের ভবিষ্যতে যে দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে তা থেকে উৎরানোর জন্য আমাদের সবার এগিয়ে আসতে হবে। মাউসেতুং এর একটি বিখ্যাত উক্তি হলো-‘ ঞঁৎহ বাবৎু ধফাবৎংরঃু রহঃড় ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃু’ অর্থাৎ প্রতিটি দুর্যোগকে সুযোগে পরিণত কর। এই সুযোগ তৈরি করার দায়িত্ব সরকারের। প্রতিটি সরকার তার ক্ষমতাকে দখলে রাখার জন্য ছাত্রদের যে ব্যাবহার করে আসছে তা অচিরেই বন্ধ করতে হবে। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ হয় ও আইনের শাসন যদি বলবৎ করা হয় তাহলে ছাত্রদের হাতে কোন অস্ত্র যাবে না এবং ছাত্ররা তাদের পড়ালেখা ও জীবন গড়ে তোলার সব কর্মস‚চি হাতে নিবে। শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো গবেষনামুলক কাজ করা ও ছাত্রদের প্রকৃত ছাত্র হিসেবে গড়ে তোলা। রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র সমাজসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের নৈতিক চেতনাবোধ না বাড়লে আমাদের রাজনৈতিক গুনাগুন বৃদ্ধি পাবে না। ছাত্রদের অংগীকার করতে হবে আমরা কোন রকম অনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করবো না। প্রত্যেকটি দলের সেন্ট্রাল লিডার থেকে তৃনমুল পর্যন্ত সহনশীলতা ও সহমর্মীতার স¤পর্ক তৈরি করতে হবে। মতের পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু কোন রকম সহিংসতার দিকে না যাওয়ার মনোবাসনা তৈরি করতে হবে।য দি সামগ্রিক এ বিষয়গুলো ছাত্ররা মেনে চলে এবং ক্যা¤পাসে নিয়মনীতির মধ্যে চলে তাহলে অতি অল্প সময়ে তারা উন্নতি করবে। আর সরকারের যে বিষয়টি করা জরুরি তা হলো শিক্ষা ব্যাব¯হাকে ঢেলে সাজানো এবং শিক্ষকদের মিনিমাম চাহিদাটুকু প‚রণ করা। শিক্ষককে অবহেলিত করে জাতি গঠন কখনো সম্ভব হতে পারে না। তবে শিক্ষকরা রাজনীতির যে চোরাগলিতে ঢুকে গেছেন সেই পংকিল রাস্তা থেকে যদি বেরিয়ে না আসেন তাহলে ছাত্রদের যত শুভ্রতার আচ্ছাদনই দেন কেন প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয়।

এখন সময় এসছে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ছাত্র রাজনীতিকে অনুধাবন করার। এবং যৌক্তিকতার মাপকাঠিতে সবচাইতে শ্রেয় বিষয়গুলির আদলে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সার্বিক সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে হবে। ছাত্র রাজনীতির দিক নির্দেশনা নিয়ে অনেকভাবনাই রয়েছে তার কিছু উপস্থাপন করছিঃ

(ক) রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ছাত্রসংগঠন সমুহের তথাকথিত লেজুড়বৃত্তি সৃলভ যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ছাত্র সংগঠনকে রাজনৈতিক দলগুলির দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের অশুভ প্রয়াস রুখতে হবে।

(খ) রাজনৈতিক দলগুলোর এইমর্মে সততা এবং স্বচ্ছতার অঙ্গীকার করা দরকার যে, তারা ছাত্র সমাজের বিবিধ সমস্যা সমাধানে যতœবান হবেন।

(গ) ছাত্ররাজনীতিতে কেবলমাত্র ছাত্রদের অংশগ্রহণই নিশ্চিত করতে হবে।

(ঘ) ছাত্ররাজনীতির গতি-প্রকৃতিকে বিশুদ্ধ করতে শিক্ষকদের অগ্রনী ভুমিকা পারন করতে হবে। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা ও দ্বায়বদ্ধতার ব্যবস্থা হতে পারে অন্যতম সহায়ক শক্তি।

(ঙ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ব্যবস্থাপনাগত দিকে উন্নয়নের যথেষ্ঠ অবকাশ রয়েছে। ঝাত্র, শিক্ষক, বিশেষ ব্যক্তিত্বসম‚হ, সর্বপরি সরকার এক্ষেত্রে উলে­খযোগ্য ভ‚মিকা রাখতে পারে।

(চ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতীর ভিত্তিতে কেবলমাত্র মেধাবী এবং সৎ ছাত্রগণই ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্বের পদ অলংকৃত করতে পারে।

নানাবিধ কারণে এখন ছাত্র রাজনীতি কুল হারিয়েছে। ছাত্র রাজনীতির উপর অনাস্থা এখন ছাত্র রাজনীতিকে নিষিদ্ধের দাবিকেও জোড়ালো করছে। তবে যে দেশের স্বাধীনতাসহ সকল আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির গৌরবউজ্জ্বল ভ‚মিকা রয়েছে সেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয় বরং জাতীয় রাজনীতিসহ সার্বিক রাজনীতিতে বড়সর সংস্কার দরকার। ডাকসু’র মত অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া এবং তা নিয়মিত করা। লেজুড়বৃত্তির চক্র থেকে বেড়িয়ে ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীর বদলে ছাত্রদের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। ছাত্র নেতাদের নৈতিকতা ও ম‚ল্যবোধ বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে ম‚ল দলকে। তবেই হয়তো সুদিন ফিরে পাবে বর্তমানে পথ হারা ছাত্র রাজনীতি। সমৃদ্ধ হবে জাতীয় রাজনীতি।

চটজলদি ছাত্ররাজনীতির স¤প‚র্ণ শুদ্ধিকরণ হয়ত অসম্ভব। কিন্তু এ ব্যাপারে বিভিন্ন পর্যায়ে করণীয় অনেক কিছুই আছে। এছাড়া স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে সুশীল সমাজের চিন্তাভাবনা ও দিক নির্দেশনা ছাত্র রাজনীতিকে যথাযথভাবেই পরিশীলিত ও গ্রহণযোগ্য করতে পারে।

আমরা ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে নই বরং ছাত্ররাজনীতিকে যে কোন ম‚ল্যে তার অশুভ এবয় অনৈতিক ধারা থেকে ফিরিয়ে আনতে চাই। আমরা চাই, ছাত্ররাজনীতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আম‚ল পরিবর্তন হোক। যদি এমনটি প্রয়োজন পড়ে যে, সার্বিক কল্যাণে ছাত্ররাজনীতি নির্দ্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হবে, তবে তাও ওভাবে দেখা হোক। সন্ত্রাসীর পরিচয় হোক সন্ত্রাসী হিসেবে আর ছাত্রের পরিচয় ছাত্র হিসেবেই — কোন ভাবেই একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়। ছাত্ররাজনীতির এই সংকট মোকাবেলার সামর্থের উপর আমাদের ভবিষ্যত পথ চলা অনেকাংশেই নির্ভর করছে।

সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্তরিকতায় লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতিবাদ দিয়ে সুষ্ঠুধারার ছাত্ররাজনীতি ফিরে আসুক এই কামনা করছি।

লেখক : গবেষক ও লেখক , সেল : ০১৭১৭৩২৪৯৭৫ , E-mail: moazzam.npc@gmail.com

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..