টানা লকডাউনে লোকসানের মুখে নরসিংদীর পাইকারী কাঁঠাল ব্যবসায়ীরা

  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। যার বৈজ্ঞানিক নাম ‘এ্যারটোকারপাস হেটরোফাইলাস’। নরসিংদীর উৎপাদিত কাঁঠাল খেতে সুমিষ্ট ও সুস্বাদু হওয়ায় এর কদর রয়েছে দেশজুড়ে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদেরও পছন্দ এ জেলার কাঁঠাল। চলমান লকডাউনে চাহিদা হ্রাস পাওয়া ন্যায্য দাম না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছে বাগান কেনা পাইকারী ব্যবসায়ীরা।

বর্তমানে কাঁঠালের ভরা মওসুম, তাই গাছে গাছে ঝুলছে শুধু কাঁঠাল আর কাঁঠাল। স্থানীয়দের দাবি, ফল মওসুমে সকালের নাস্তা মানেই কাঁঠাল। মধুর মতো মিষ্টি এখানকার কাঁঠাল। মুখে দিতেই রসে টইটম্বুর। সবুজ, লালচে, কালচে, হলুদাভ ইত্যাদি রঙের কাঁঠালের পাশাপাশি গালা, খাজা ও রসখাজা এ তিন জাতের কাঁঠালই এখানে বেশি ফলন হচ্ছে। তাছাড়া গোল, মাঝারি, লম্বা এ তিন আকারের কাঁঠাল বেশি। স্বাদে ও গন্ধে এখানকার কাঁঠালের সুনাম সারাদেশ জুড়ে। কাঁঠালের এ ভরা মওসুমে জেলার কাঁঠালের হাট গুলোতে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উঠছে।

কাঁঠাল ভালোবাসে না এমন লোক পাওয়া খুবই দুষ্কর। তারপরও যদি হয় মিষ্টি ও সুস্বাদু তাহলে তো আর কিছু বলারই থাকেনা। কাঁঠালের কোন অংশই বাদ যায় না। কাঁঠাল দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। কাঁঠালের বীচি ভর্তা ও তরকারী হিসাবে ব্যবহার করে খাওয়া যায়। এর বাহিরের অংশ যাকে স্থানীয় ভাষায় কেত্তা/বোতা বলে সেটাও গরু, মহিষ ও ছাগলকে খাওয়ানো হয়।

এছাড়াও কাঁঠালে রয়েছে সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম। যাতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। শুধু তাই নয়, এ ফল হৃদযন্ত্র ভালো রাখতেও সহায়তা করে। কাঁঠালে রয়েছে আয়রন যা রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়ায়। কাঁঠালে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট থাকার ফলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে। কাঁঠাল শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ক্যান্সার ও টিউমারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে, পাইলস ও কোলন ক্যান্সারের আশঙ্কা কমায়। তাছাড়া প্রচুর ভিটামিন সমৃদ্ধ এ ফল চোখ ও দেহ ভালো রাখতে সাহায্য করে। আবার কাঁঠাল গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি করা যায় দৃষ্টিনন্দন ফানিচারও। যা অনেক টিকসই ও মজবুত হয়।

তাই এ জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে একমাত্র চরাঞ্চল বাদে কম-বেশি সব জায়গায়ই কাঁঠালের ফলন হয়। তার মধ্যে শিবপুর, বেলাব, পলাশ, মনোহরদী ও রায়পুরা উপজেলার লালমাটি অধ্যূষিত পাহাড়ী এলাকার চাষিরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কাঁঠালের আবাদ করে থাকেন। বাজারে এসব এলাকার কাঁঠালের বেশ চাহিদা থাকায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে কাঁঠালের বাগানের সংখ্যা। তাইতো লালমাটি অধ্যূষিত পাহাড়ী এলাকার অনেকে কাঁঠাল বাগান করে ঘুরিয়েছেন নিজের ভাগ্যের চাকা।

এ বছর অন্যান্য বছরের ন্যায় কাঁঠালের ফলন কিছুটা কম হলেও মৌসুমের শুরুতে চাষিরা ভাল দাম পেলেও মহামারি করোনা ও লগডাউনের কারণে হাট-বাজার গুলোতে মানুষ উপস্থিতি কম থাকায় কাঁঠালের চাহিদা অনেকটাই হ্রাস পায়। ফলে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কাঠালের পাইকারী ব্যবসায়িরা। আগে থেকেই পাইকাররা চাষিদের কাছ থেকে দরদাম করে কাঁঠাল বাগান কিনে ফেলায় চাহিদা হ্রাসে চাষি পর্যায়ে খুব প্রভাব না ফেললে ভবিষ্যতে তা ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে মনে করছে চাষিরা। ন্যায্য দাম না পেয়ে এবছর যে দামে বাগান কিনেছে আগামী বছর সেই দাম নাও দিতে পারে।

পাইকাররা মৌসুমের শুরুতে চাষীদের কাছ থেকে ক্রয় করে নেওয়ায় বাগান থেকে আস্তে আস্তে কাঁঠাল কেটে ট্রাকযোগে বিভিন্ন হাট-বাজারসহ রাজধানির কাওরান বাজারে আড়ৎএ বিক্রির জন্যে  নিয়ে যায়। ওখান থেকে কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়।

কাঠাল চাষিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল উৎপাদনে নরসিংদীর আদিকাল থেকেই ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখে আসছে। আর এখানের উৎপাদিত কাঁঠাল স্থানীয়দের চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

জেলার ৬টি উপজেলার সর্বত্রই কাঁঠাল কমবেশী উৎপাদন হলেও শিবপুর, বেলাব, পলাশ, মনোহরদী ও রায়পুরা উপজেলার লালমাটি অধ্যূষিত পাহাড়ী এলাকার চাষিরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কাঁঠালের আবাদ করে আসছেন।

নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর নরসিংদী জেলায় ২ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়। এ থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র ধরা হয়েছে হেক্টর প্রতি ১৫ থেকে ১৬ মে: টন। এছাড়াও এ জেলার কৃষকরা বাগান সৃজনের পাশাপশি বাড়ীর আঙ্গিনায়, পুকুর পাড়, রাস্তার পাশে ও পরিত্যাক্ত ভূমিতে কাঁঠাল বৃক্ষ রোপন করে কাঁঠাল চাষে ব্যাপক ভূমিকা রেখে আসছে। আগের দিনে মানুষেরা পারিবারিক চাহিদা মেটাতে বাড়ীর আশপাশ এলাকায় কাঁঠাল গাছ লাগাত। কিন্তু বর্তমানে একটি লাভজনক ফল হিসেবে মানুষের চিন্তা-ভাবনা এসেছে পরিবর্তন। জেলার চাষিরা বাণিজ্যিক ভাবে কাঁঠান চাষ শুরু করেছে। এখন যেদিকে চোখ যায় সেখানে দেখা মিলে কাঠাল গাছ।

করোনার কারণে চাহিদা থাকা সত্বেও মৌসুমী পাইকারা বিভিন্ন স্থানে নিতে পারছেন না এ জেলার উৎপাদিত কাঁঠাল। তাছাড়া লকডাউনের ফলে হাট-বাজারগুলো ক্রেতা সংখ্যাও কম। সব মিলে বাজারে কাঁঠালের জোগান থাকলেও ক্রেতার অভাবে কিছুটা দরপতন হয়েছে। বর্তমান বাজারে একটি বড় সাইজের কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। ছোট সাইজের একটি কাঁঠাল বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়।

সরেজমিনে বেশ কয়েকটি পাইকারী হাট ঘুরে দেখা গেছে, জৈষ্ঠ মাস হতে আষাঢ় মাসে জেলার কাঁঠালে হাটগুলো জমে উঠলেও অধিকাংশ হাটে পাইকারের উপস্থিতি  নেই বললেই চলে। কয়েকটি হাটে অল্প সংখ্যক পাইকার থাকলেও নেই তাদের মধ্যে তেমন কোন ব্যস্ততা। অন্যদিকে কিছু কিছু পাইকারদের তাদের পূর্বের কেনা বাগান থেকে কাঁঠাল কেটে ট্রাক বুঝায় করতে দেখা গেছে।

শিবপুরের জয়নগর এলাকায়  হোসেন আলী নামে এক পাইকারী ব্যবসায়ীর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘আমি এ বছর তিনটি বাগান ৫ লাখ টাকায় কিনেছি। সিজনের শেষে ৩ লাখ টাকা হাত আসব কিনা সন্দেহ আছে। আমরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকি এই সময়টার জন্য। আমরা ধার-দেনা করে বাগান ক্রয় করে বছর শেষে যদি লোকসান গুণতে হয়। তবে ভিটে –মাটি বিক্রি করে বৌ-পোলাপান নিয়ে রাস্তা গিয়ে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।

শিবপুর উপজেলার যোশর বাজারে আসা বিভিন্ন জেলার কয়েকজন পাইকারী ব্যবসায়ী জানান, আগে তাদের হরদম কাঁঠাল বেচাকেনা হয়েছে এবং ব্যবসাও ভাল হয়েছে। বর্তমানে আমরা যে দরে হাট থেকে কাঁঠাল ক্রয় করছি, এর আগে একই সাইজের কাঁঠাল দ্বিগুণ বা তার চাইতেও বেশী দরে আমরা চাষিদের কাছ থেকে পাইকারী দামে কিনে নিতাম। করোনা ও লগডাউনের কারনে হাটে আমরা ক্রেতা পাচ্ছি কম, তাই আমাদের এলাকার চাহিদা বিবেচনা করে, কম কম কাঁঠাল পাইকারী কিনে নিচ্ছি।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মরজাল বাজারে কাঠাল বিক্রিতা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘লকডাউনে বাজারে পাইকার কম। আমি সকাল ৮টায় দিকে ১০০টাকায় ভ্যান গাড়ী ভাড়া করে ২০টি কাঁঠাল  নিয়ে এ বাজারে আসছি, বেলা ১২টা পর্যন্ত মাত্র ৫টি কাঁঠাল বিক্রি করতে পারছি। বাকী কাঁঠাল বিক্রি করতে পারব কিনা তা নিয়ে সংশয়ে আছি।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর বলেন, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এবার কাঁঠালের চাষ একটু বেশি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে চাষিরা কাঁঠাল বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছেন। কিন্তু করোনা ও লকডাউনের কারণে বাজারে ক্রেতা সংখ্যা কম থাকায় কাঁঠালের দাম সাময়িক কিছুটা  হ্রাস পেয়েছে, তবে এ মন্দাভাব কেটে যাবে।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..