লকডাউনে লটকনের ন্যায্য দাম না পেয়ে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘বুগি’ নামে ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ লটকন দেশীয় জাতের একটি ফল। যা অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ওষধি গুণে ভরপুর। একসময়ে একে জংলি ফল বলা হতো। বন-বাদাড়ে ঝোপ-ঝাড়ে জন্ম নেওয়া গাছে ধরে থাকতো এ ফল। তেমন একটা কদর ছিল না। তবে সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে এ ফলের পুষ্টিগুণ সবার জেনে গেছে। তাই কদর বেড়েছে বহুগুণ। এর ইংরেজি নাম হলো Burmese grape ও বৈজ্ঞানিক নাম- Baccaurea sapida এর বৃক্ষ মাঝারি আকারের চির সবুজ। ফল গোলাকার, পাকলে এর ফল হলুদ বর্ণ ধারণ করে।

বাণিজ্যিক চাষের পাশাপাশি দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে চলতি লটকন মওসুমে করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে লকডাউনে অব্যহত থাকায় নরসিংদীর অর্থনীতিতে  গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এই ফলটির রপ্তানীর বিষয়টি প্রশ্নের সম্মুখিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  এছাড়াও বাজারগুলোতে ক্রেতা উপস্থিতি কম থাকায় লটকন নিয়ে বিপাকে রয়েছে বাগান খরিদ করা পাইকারী ব্যবস্য়ীরা। একদিকে ধারে টাকা পরিশোধের চিন্তা অন্যদিকে লকডাউনে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত। উভয় সংকটে ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত।

লটকন অত্যন্ত পুষ্টিকর,সুস্বাদু ও ভিটামিন বি-২ সমৃদ্ধ একটি ফল। এই ফলে চর্বি অত্যন্ত কম। তাছাড়া এ ফলে কোন শর্করা না থাকায় সকল বয়সের মানুষ কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।

সুস্বাদু টক-মিষ্টি লটকনের কথা এলেই নরসিংদীর নামটা চলে আসে সবার আগে। কারণ এ অঞ্চলের লটকন অন্য যে কোনো জেলার উৎপাদিত লটকনের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে মিষ্টি এবং রসালো হয়। এখানকার বেলে ও দো-আঁশ মাটিতে ফলটির ফলন ভালো হয়। সেজন্য এ জেলার মানুষজন লটকনের বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করছে। প্রতিবছরই বাড়ছে লটকন চাষের সংখ্যা ও এর উৎপাদন। আর্থিকভাবে বেশ লাভবানও হচ্ছেন এ জেলার চাষিরা। লটকন চাষ করে ভাগ্যবদল হয়েছে হাজারো কৃষকের। বিগত বছরে তুলনায় এবছর  খুব একটা ভাল ফলন হয়নি। মওসুমের শুরুতেই গাছে গাছে ছত্রাকে আক্রান্ত হয় লটকন ফল। স্থানীয় কৃষি অফিসগুলো থেকে কৃষক পর্যায়ে কোন রকম পরামর্শ ও সহযোগিতা না পাওয়ায় এর ফলন কম হয়।

অন্য দিকে মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দেশে চলমান লকডাউনের ফলে বিক্রির আশঙ্কায় বাগান খরিদ করা পাইকারী ব্যবস্য়ীরা অনেক তড়িগড়ি করেই গাছ থেকে তুলে নেয়। স্থানীয় পাইকারী বাজারগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন আড়ৎগুলোতে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পাইকারী ব্যবসায়ীরা। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছে ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়দের কাছে এ ফলটিকে ‘বুগি’ নামে বেশি পরিচিত। গাছটির কাণ্ড থেকে বের হওয়া এ লটকনের থরে থরে ঝুলে থাকার দৃশ্য যে কারোরই নজর কাড়বে। বর্ষায় ভিজে থাকা প্রকৃতিতে এ দৃশ্য আরও বেশি ফুটে ওঠে। অপ্রচলিত এ ফলটি একসময় পুষ্টিকর ফল  হিসেবে  ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং নরসিংদীর মানুষের অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়। প্রায়  ত্রিশ বছর পূর্বে  বেলাব উপজেলার লাখ পুর গ্রামে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক ভাবে লটকনের আবাদ শুরু হয় । এরপর থেকে বেলাব ও  শিবপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের লাল মাটির এলাকায় লটকন চাষের প্রসার ঘটতে থাকে।  মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে খাদ্য ও পুষ্টি গুণ সমৃদ্ধ লটকনের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে ব্যাপক চাহিদা ও লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই লটকনের চাষ বাড়তে থাকে। এই দুই উপজেলায় প্রায় প্রতিটি পরিবারের অর্থনীতির মূল  চালিকা শক্তি এখন লটকন। লটকন চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি বেকার সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছে অনেকে।

পুষ্টিবিদদের মতে, মানুষের শরীরে একদিনে যে পরিমাণ ভিটামিন ‘সি’ প্রয়োজন মাত্র তিন থেকে চারটি লটকন সে চাহিদা মেটাতে পারে। ছোট এ ফলটি ভিটামিন ‘বি-টু’, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদানে ভরপুর। যা এই করোনাকালে আমাদের সবার শরীরের জন্য খুবই উপকারী।

লটকন গাছ সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে রোপণের উপযুক্ত সময়। বর্ষার শেষের দিকে অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাসেও গাছ লাগানো যায়। লটকনের গাছ লাল মাটিতে ঝোপের মতো হয়ে থাকে। প্রতিবছর মাঘ-ফাল্গুনে লটকন গাছে মুকুল আসা শুরু হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে এ ফল পরিপক্কতা পায়। এটি চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। স্ত্রী গাছ লাগিয়ে দিলেই হয়। সময়ে সময়ে একটু পরিচর্যা করতে হয়। গোড়ার চারদিকে জৈব সার দিলে ফলন ভালো হবে। পিঁপড়া বা পোকামাকড়ের হাত থেকে ফল বাঁচাতে ছত্রাকনাশক দিতে হয়।

নরসিংদী জেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান, তাই এখানে লটকনের ভালো ফলন হয়। চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে লটনকনের বাগান করা হয়েছে। যা হেক্টর প্রতি ১৫ টন হারে ২৪ হাজার মেট্রিক টন (এক টন সমান ১০১৬ কেজি) লটকনের ফলন পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ। আর উৎপাদিত এ লটকন পাইকারি ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যার মূল্য পাওয়া যাবে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।

কৃষি অধিদপ্তর জানায়, রোপণের তিন বছরের মধ্যে লটকন গাছে ফলন আসে। প্রতিটি গাছ ফল দেয় টানা ২০ থেকে ৩০ বছর। লটকন গাছের রোগবালাই তেমন দেখা যায় না। ফল সংগ্রহের ৬০ দিন আগে গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা ও আকার বৃদ্ধি পায়।

এ ফল চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিক্রির জন্য কোন টেনশন করতে হয় না। পাইকারী ব্যবসায়ীরা লটকন কাঁচা থাকা অবস্থায় চাষিদের কাছ থেকে বাগান খরিদ করে নেয়। বাগান খরিদের পদ্ধতিতে রয়েছে ভিন্নতা। প্রথমে বাগানের মালিকের কাছ থেকে একদল পাইকার দাম-দর করে বাগান ক্রয় করেন, পরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পাকা লটকন বাগান থেকে সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেন। প্রকারভেদে পাইকারি মণ প্রতি দাম ওঠে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা। যা খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৮০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে নরসিংদীর সু-স্বাদু এ লটকন ফল। কিন্তু এ বছর মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দেশের বাইরে রপ্তানি করার সম্ভব হবে কি তা নিয়ে সংশয় রয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা মাঝে।

এদিকে মৌসুমী এ ফলের বেচাকেনাকে ঘিরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরার মরজাল, বেলাবরের বাড়ৈচা, পলাশের রাবান ও শিবপুর উপজেলা সদরে ও যোশরে বসছে লটকনের পাইকারী বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা এসে এসব বাজার থেকে কিনে নিয়ে যায় লটকন। পর্যায়ক্রমে হাত বদল হয়ে লটকন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার বাজারে। অনেকে সরাসরি বাগান থেকে লটকন কিনে সরবরাহ করছেন।

শিবপুর উপজেলার জয়নাগর ইউনিয়নের কামরাব গ্রামের শাহাদাৎ হোসেন আলোকিত খবরকে বলেন, কম খরচে লাভজনক ফসলের মধ্যে লটকন একমাত্র । লটকন বাগান শুরু করতে প্রথমে খরচ বেশি পড়লেও পরবর্তি সময়ে বিঘা প্রতি ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয় না। সে তুলনায় লাভ বেশি হয়। এছাড়া লটকন ফলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট হচ্ছে গাছের কাণ্ডে ফল ধরে। কখনও কখনও এত বেশি ফল আসে যে গাছের ডাল পর্যন্ত দেখা যায় না। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

তিনি আরও বলেন, এ বছর আশানুরোপ ফলন পাওয়া যায়নি। মৌসুমের শুরুতে গাছগুলো ছত্রাকে আক্রান্ত হয়। এ অবস্থায় স্থানীয় কৃষি অফিসের কোন পরামর্শ ও সহযোগিতা আমরা পাইনি। এ বছর কৃষি অফিসের কোন কর্মকর্তা বা মাঠ পর্যায়ের কাউকে আমাদের বাগানগুলো পরিদর্শন করতে দেখিনি।

বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামের বাগান মালিক মানিক মোল্লা জানান, লটকন ফল বিক্রির ভাবনা ভাবতে হচ্ছে না তাদের। স্থানীয় বাজার ছাড়াও লটকনের ফল ধরার পর বাগান বিক্রি করে দেওয়া যায়। পাইকাররা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দুই একর জমিতে লটকন বাগান করেছেন। এ বছর একটি লটকন বাগান ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং আরেকটি বাগান ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।

বাগান খরিদ করা পাইকারী ব্যবসায়ী হারিছ মিয়া বলেন, এবছর আমি ধার-দেনা করে ৭ লাখ টাকায় ৩ টি বাগান কিনেছি। শুরুর দিকে ভাল দাম পেলেও বর্তমানে এর অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় হিসাব করলে দেখা যাবে প্রায় তিন থেকে আড়াই লাখ টাকা লোকসান দিতে হবে আমাকে। ধারে টাকা কিভাবে শোধ করবে সেই এখন আমার দু:চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাগান থেকে লটকন কিনতে আসা ফরিদ হোসেন নামে অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, শুরু দিকে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা মন ধরে বিক্রি করতে পারলেও বর্তমান লকডাউনের কারণে তা বিক্রি করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। তাছাড়া পরিবহন খরচও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর বলেন, লটকন চাষ বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চারা উৎপাদন করা সহ কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানি হওয়াতে কৃষকরা লটকনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন । চলতি মৌসুমে ১৬০০  হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে । প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিকটন ফলন হিসেবে লটকনের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ হাজার মেট্রিকটন যার পাইকারি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ১৬৮ কোটি টাকা।

Facebook Comments

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..