বাংলাদেশের অর্থনীতি এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন সীমাবদ্ধতা। এই প্রেক্ষাপটে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, কিন্তু একই সঙ্গে তা বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে আবৃত। নীতিগতভাবে এই উদ্যোগের মধ্যে যেমন সম্ভাবনার আলো রয়েছে, তেমনি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা, যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

প্রথমত, এই উদ্যোগের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অনুধাবন করা জরুরি। ঘোষিত লক্ষ্য- প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি- শুনতে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে তা অর্জন ততটাই কঠিন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা শুধু অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে না; বরং এর সঙ্গে জড়িত থাকে বাজার, অবকাঠামো, দক্ষতা, এবং সর্বোপরি সুশাসন। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চাপ অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নীতি গ্রহণে প্রভাব ফেলেছে, যার ফল হয়েছে উল্টো।

বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি কাঠামোবদ্ধ উদ্যোগ। যেসব কারখানা শুধুমাত্র কার্যকরী মূলধনের অভাবে উৎপাদনে ফিরতে পারছে না, তাদের দ্রুত সহায়তা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব। এটি তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু সমস্যার গভীরতা শুরু হয় মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে।

যেসব কারখানার গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, যন্ত্রপাতি অচল, কিংবা বাজার হারিয়েছে- তাদের পুনরুজ্জীবন কেবল অর্থ ঢাললেই সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন পুনর্গঠন, প্রযুক্তি আপডেট, বাজার পুনরুদ্ধার এবং ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি আর্থিক নয়, একটি কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন। আর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা মানে প্রায় নতুন করে বিনিয়োগের সমান। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রকৃতপক্ষে নতুন শিল্পায়নের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, যার ঝুঁকি আরও বেশি।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট গ্যারান্টির দাবি মোটেই অযৌক্তিক নয়। বরং এটি ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণের বোঝা, অর্থপাচার এবং দুর্বল কর্পোরেট শাসনের কারণে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা চাইবে।

প্রশ্ন হলো, এই গ্যারান্টি কে দেবে এবং কীভাবে দেবে? যদি সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্যারান্টি দেয়, তবে তা কার্যত জনগণের অর্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। অতীতে আমরা দেখেছি, প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে ফেরত আসেনি। করোনাকালে গৃহীত প্রণোদনা কার্যক্রম তার একটি বড় উদাহরণ। তখন দ্রুত অর্থ বিতরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে আদায় প্রক্রিয়া দুর্বল ছিল। ফলে একই ভুল আবার হলে তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়নের উৎস। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, নাকি বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী—কে কতটুকু অর্থ দেবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়। এই অনিশ্চয়তা পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনে নিরুৎসাহিত করছে, তখন এই উদ্যোগের অর্থায়ন কাঠামো আরও জটিল হয়ে ওঠে।

আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যমান পুনঃঅর্থায়ন তহবিল কমিয়ে আনার কথা, নতুন তহবিল গঠন নয়। এর পেছনে যুক্তি হলো- অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি করলে তা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং বাজার বিকৃত করতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সরাসরি অর্থায়নে যায়, তবে তা আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

আবার যদি সরকার সরাসরি অর্থ দেয়, তবে বাজেট ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে একটি বিষয় পরিষ্কার- শুধু অর্থ ঢাললেই সমস্যা সমাধান হবে না। প্রয়োজন সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ব্যাংকগুলো যে পরামর্শক বসানোর কথা বলছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। কারণ অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হয়নি। যদি তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায়, তবে ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে- ব্যাংক কি শিল্প পরিচালনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে? এটি করলে উদ্যোক্তার স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতার মধ্যে একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। অন্যথায় এটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো-কারা এই অর্থায়নের সুবিধা পাবে। বলা হয়েছে, যারা জালিয়াতি বা অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত নয়, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এই বাছাই প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ হবে? অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে অর্থায়নের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে এই উদ্যোগও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে বাজার বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে কারণ তাদের পণ্যের চাহিদা কমে গেছে বা তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। সেক্ষেত্রে শুধু অর্থায়ন দিয়ে তাদের টিকিয়ে রাখা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। বরং তা ‘জম্বি’ শিল্প তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এখানে নীতিনির্ধারকদের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে- সব বন্ধ কারখানা কি পুনরুজ্জীবিত করা উচিত, নাকি কেবল সম্ভাবনাময়গুলোকে বেছে নেওয়া উচিত? বাস্তবতা হলো, সীমিত সম্পদের মধ্যে বাছাই করতেই হবে। এবং সেই বাছাই হতে হবে স্বচ্ছ ও তথ্যভিত্তিক।

এছাড়া শ্রমবাজারের দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে গেলে শুধু কারখানা চালু করলেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ শ্রমশক্তি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কারখানা চালু হলেও দক্ষ কর্মীর অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে এই উদ্যোগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে, এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। পরিকল্পনা যতই ভালো হোক, যদি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত না হয়, তবে তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং সুশাসন। বন্ধ কলকারখানা চালুর এই উদ্যোগ সেই পথে একটি পদক্ষেপ হতে পারে, যদি তা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অন্যথায় এটি আরেকটি ব্যর্থ প্রণোদনা কর্মসূচিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।