ঢাকা ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: আর্থিক খাতে নতুন চমকের নাম মোস্তাকুর রহমান : অয়ন আহমেদ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৩৯:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
আলোকিত খবর অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে যুক্ত হলো। এদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মোস্তাকুর রহমান। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন সক্রিয় ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাবিকাঠি ও মুদ্রানীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রথা- যেখানে আমলা বা তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদরা এই গদিতে বসতেন- তা ভেঙে একজন ‘মাঠ পর্যায়ের’ ব্যবসায়ীকে এই দায়িত্বে আনা আর্থিক খাতের ইতিহাসে এক সাহসি ও অভূতপূর্ব মোড়।

মোস্তাকুর রহমান মূলত দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত- তৈরি পোশাক শিল্পের একজন সফল সারথি। ফতুল্লা-ভিত্তিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে তিনি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল একজন শিল্পপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ১৯৯১ সালে এফসিএমএ (FCMA) ডিগ্রি অর্জনকারী একজন তুখোড় পেশাজীবী। ৩৩ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ব্যবসায়িক কৌশল ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার এক বিরল সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন।

গভর্নর হওয়ার আগে মোস্তাকুর রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বিজিএমইএ-এর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সুবাদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জটিল নীতিমালাগুলো কাছ থেকে দেখেছেন। এছাড়া ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্য হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারের উত্থান-পতনকেও তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর চেয়ে উচ্চতর স্তরের ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ছিলেন এ এন এম হামিদুল্লাহ থেকে শুরু করে ফজলে কবির বা আব্দুর রউফ তালুকদারের মতো তুখোড় আমলারা কিংবা ড. আতিউর রহমানের মতো প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, ডলার সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। এমন এক সংকটে সরকার হয়তো প্রচলিত তাত্ত্বিক সমাধানের বাইরে গিয়ে ‘ব্যবহারিক’ বা ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তা করতে চেয়েছে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে মোস্তাকুর রহমান জানেন কেন ঋণ খেলাপি হয়, এলসি খুলতে কী ধরনের বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এবং উচ্চ সুদের হার কীভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ধ্বংস করে।

রহমানের এই নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক সংযোগও অনস্বীকার্য। তিনি বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক এই পটভূমি তাঁর নিয়োগে প্রভাবক হিসেবে কাজ করলেও, তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কোনো রাজনৈতিক রঙের চেয়ে অনেক বেশি বড়। তাকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হয়েছে যখন দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি তাঁর লক্ষ্যগুলো স্পষ্ট করেছেন। তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার হলো সুদের হার কমানো। বর্তমানে উচ্চ সুদের হারের কারণে দেশের বেসরকারি খাত নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা। একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছিল, যা নিরসন করা তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা তাঁর জন্য এসিড টেস্টের মতো।

ইতিহাস সবসময় ফলাফল দিয়ে বিচার করে। মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগকে অনেকে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে দেখতে পারেন, কারণ একজন ঋনগ্রহীতা ও ব্যবসায়ী এখন নিজেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান। তবে ইতিহাসের অন্য পিঠে এটি একটি সুযোগও। যদি তিনি তাঁর ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ের কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেন, তবে তিনি হবেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল গভর্নরদের একজন।

মোস্তাকুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এখন একটি ব্যবস্থার নাম। একজন পোশাকি ব্যবসায়ী থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিভাবক হওয়ার এই যাত্রাটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি দায়িত্বের ভারে অতিশয় গুরুতর। দেশের আপামর জনসাধারণ ও ব্যবসায়িক সমাজ এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি কি পারবেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজাল ছিন্ন করে একটি গতিশীল ও স্বচ্ছ আর্থিক কাঠামো উপহার দিতে? ইতিহাসের পাতায় তাঁর মূল্যায়ন কেবল সময়ের হাতে। তবে তাঁর এই নিয়োগ যে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট: কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচক-
মোস্তাকুর রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী অর্থনীতির চিত্রটি দেখা যায়-
১। মুদ্রাস্ফীতি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রায় ৯% থেকে ১০%-এর ঘরে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা নতুন গভর্নরের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
২। খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার উপরে।
৩। রিজার্ভের স্থিতি: বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বর্তমানে ১৯ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে।
৪। টাকার মান: গত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৩০% এর বেশি অবমূল্যায়িত হয়েছে।

পূর্ববর্তী গভর্নরদের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে নেতৃত্বের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা নিচের ছকটি থেকে স্পষ্ট হয়:

পূর্ববর্তী আমলা গভর্নরদের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায়ই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, মোস্তাকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ‘বাজারের ভাষা’ বোঝেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নীতিতে আরও বেশি বাজার-কেন্দ্রিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এড়ানোই হবে তাঁর প্রধান নৈতিক পরীক্ষা।

লেখক পরিচিতি:
অয়ন আহমেদ, সম্পাদক- দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
Email: protidinerchitrobd14@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর: আর্থিক খাতে নতুন চমকের নাম মোস্তাকুর রহমান : অয়ন আহমেদ

আপডেট সময় : ০৪:৩৯:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৫৪ বছরের ইতিহাসে ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে যুক্ত হলো। এদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মোস্তাকুর রহমান। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন সক্রিয় ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাবিকাঠি ও মুদ্রানীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রথা- যেখানে আমলা বা তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদরা এই গদিতে বসতেন- তা ভেঙে একজন ‘মাঠ পর্যায়ের’ ব্যবসায়ীকে এই দায়িত্বে আনা আর্থিক খাতের ইতিহাসে এক সাহসি ও অভূতপূর্ব মোড়।

মোস্তাকুর রহমান মূলত দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত- তৈরি পোশাক শিল্পের একজন সফল সারথি। ফতুল্লা-ভিত্তিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে তিনি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল একজন শিল্পপতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ১৯৯১ সালে এফসিএমএ (FCMA) ডিগ্রি অর্জনকারী একজন তুখোড় পেশাজীবী। ৩৩ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ব্যবসায়িক কৌশল ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার এক বিরল সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন।

গভর্নর হওয়ার আগে মোস্তাকুর রহমান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বিজিএমইএ-এর বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সুবাদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জটিল নীতিমালাগুলো কাছ থেকে দেখেছেন। এছাড়া ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্য হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারের উত্থান-পতনকেও তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর চেয়ে উচ্চতর স্তরের ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ছিলেন এ এন এম হামিদুল্লাহ থেকে শুরু করে ফজলে কবির বা আব্দুর রউফ তালুকদারের মতো তুখোড় আমলারা কিংবা ড. আতিউর রহমানের মতো প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, ডলার সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। এমন এক সংকটে সরকার হয়তো প্রচলিত তাত্ত্বিক সমাধানের বাইরে গিয়ে ‘ব্যবহারিক’ বা ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তা করতে চেয়েছে। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে মোস্তাকুর রহমান জানেন কেন ঋণ খেলাপি হয়, এলসি খুলতে কী ধরনের বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় এবং উচ্চ সুদের হার কীভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ধ্বংস করে।

রহমানের এই নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক সংযোগও অনস্বীকার্য। তিনি বিএনপির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক এই পটভূমি তাঁর নিয়োগে প্রভাবক হিসেবে কাজ করলেও, তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কোনো রাজনৈতিক রঙের চেয়ে অনেক বেশি বড়। তাকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হয়েছে যখন দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি তাঁর লক্ষ্যগুলো স্পষ্ট করেছেন। তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার হলো সুদের হার কমানো। বর্তমানে উচ্চ সুদের হারের কারণে দেশের বেসরকারি খাত নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনা। একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছিল, যা নিরসন করা তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা তাঁর জন্য এসিড টেস্টের মতো।

ইতিহাস সবসময় ফলাফল দিয়ে বিচার করে। মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগকে অনেকে ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে দেখতে পারেন, কারণ একজন ঋনগ্রহীতা ও ব্যবসায়ী এখন নিজেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান। তবে ইতিহাসের অন্য পিঠে এটি একটি সুযোগও। যদি তিনি তাঁর ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ের কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেন, তবে তিনি হবেন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল গভর্নরদের একজন।

মোস্তাকুর রহমান কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এখন একটি ব্যবস্থার নাম। একজন পোশাকি ব্যবসায়ী থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভিভাবক হওয়ার এই যাত্রাটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি দায়িত্বের ভারে অতিশয় গুরুতর। দেশের আপামর জনসাধারণ ও ব্যবসায়িক সমাজ এখন তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি কি পারবেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজাল ছিন্ন করে একটি গতিশীল ও স্বচ্ছ আর্থিক কাঠামো উপহার দিতে? ইতিহাসের পাতায় তাঁর মূল্যায়ন কেবল সময়ের হাতে। তবে তাঁর এই নিয়োগ যে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট: কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূচক-
মোস্তাকুর রহমান এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী অর্থনীতির চিত্রটি দেখা যায়-
১। মুদ্রাস্ফীতি: ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রায় ৯% থেকে ১০%-এর ঘরে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা নতুন গভর্নরের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
২। খেলাপি ঋণ: ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, যা বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকার উপরে।
৩। রিজার্ভের স্থিতি: বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ বর্তমানে ১৯ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে অবস্থান করছে।
৪। টাকার মান: গত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৩০% এর বেশি অবমূল্যায়িত হয়েছে।

পূর্ববর্তী গভর্নরদের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে নেতৃত্বের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা নিচের ছকটি থেকে স্পষ্ট হয়:

পূর্ববর্তী আমলা গভর্নরদের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায়ই অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, মোস্তাকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ‘বাজারের ভাষা’ বোঝেন। ফলে তাঁর নেতৃত্বে মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নীতিতে আরও বেশি বাজার-কেন্দ্রিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এড়ানোই হবে তাঁর প্রধান নৈতিক পরীক্ষা।

লেখক পরিচিতি:
অয়ন আহমেদ, সম্পাদক- দৈনিক প্রতিদিনের চিত্র, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
Email: protidinerchitrobd14@gmail.com