আইন আছে, রাষ্ট্র আছে- তবু কেন ‘খেলা হবে’?
- আপডেট সময় : ১০:২৩:৩৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে

নরসিংদীর রায়পুরার সরকারি আদিয়াবাদ ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজকে ঘিরে যা ঘটছে, তা আর শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়- এটি আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি কঠিন পরীক্ষা।
একটি শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠতেই পারে। সেটি তদন্ত ও সমাধানের জন্য এই রাষ্ট্রে স্পষ্ট কাঠামো রয়েছে- ইউএনও, ডিসি, শিক্ষা বিভাগ, দুদক, আদালত। প্রশ্ন হচ্ছে- এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি এখন অপ্রাসঙ্গিক? নাকি কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এসব প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে “নিজেই বিচারক” হওয়ার পথে হাঁটছেন?
স্থানীয়ভাবে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ রয়েছে, আদিয়াবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি নাজমুল হক বাদল সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তার লোকজন সাথে নিয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। আরও গুরুতর অভিযোগ- গত ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানের ভিতর প্রবেশ করে তার লোকজন অধ্যক্ষ নূর শাখাওয়াত হোসেন মিয়াকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করছেন। ঘটনার ভিডিওক্লিপ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন ভাইরাল। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে এভাবে অপদস্থ করার ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়- এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি একটি অবমাননা।
ঘটনার ধারাবাহিকতা এখানেই থেমে নেই। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ের পক্ষে প্রাক্তন নারী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে হামলার অভিযোগও উঠেছে। সেখানে উপস্থিত সংবাদকর্মীরাও রেহাই পাননি- যা পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ওই অডিওতে শোনা যাচ্ছে- নিজেকে নাজমুল হক বাদল পরিচয় দিয়ে অধ্যক্ষকে হুমকি দিচ্ছেন: “কোন ইউএনও, ডিসি, মন্ত্রী-মিনিস্টার আপনাকে ঢুকাতে পারবে না… আসুন, খেলা হবে।”
অডিওটির ভাষা ও বার্তা জনমনে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন তুলে দিয়েছে- রাষ্ট্রের আইন কি এখন ব্যক্তির প্রভাবের কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে?
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই অবস্থান যদি আইন ভেঙে, শক্তি প্রদর্শন করে এবং একটি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ভেঙে দেয়- তাহলে সেটি আর ন্যায়বিচারের সংগ্রাম থাকে না, বরং সেটি নিজেই আইনের শাসনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক দল এবং সরকার- উভয়েরই ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আদিয়াবাদের মতো একটি এলাকায়, যেখানে আরও অভিজ্ঞ ও সিনিয়র রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে, সেখানে এ ধরনের একক ও বিতর্কিত পদক্ষেপ স্পষ্টতই সমন্বয়হীনতা এবং দায়বদ্ধতার অভাবের ইঙ্গিত দেয়|
এখন প্রশ্নটা আর ছোট নয়- এই পরিস্থিতির দায় কে নেবে?
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল কি নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবেন, নাকি দ্রুত কার্যকর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবেন? সময় যত গড়াচ্ছে, ততই শিক্ষা পরিবেশ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে যাচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বাড়ছে।
একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার- রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রকেই অকার্যকর প্রমাণ করার যে প্রবণতা, তা দীর্ঘমেয়াদে কারো জন্যই কল্যাণকর নয়।
আইন যদি থাকে, তবে তার প্রয়োগও থাকতে হবে। আর যদি কেউ বিশ্বাস করেন- “কেউ কিছু করতে পারবে না”- তাহলে সেটি শুধু একটি বক্তব্য নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ| এই চ্যালেঞ্জের জবাব কে দেবে- এখন সেটিই দেখার বিষয়।
মোঃ মোস্তফা খান (সাংবাদিক)
সাবেক সভাপতি- রায়পুরা প্রেসক্লাব, নরসিংদী|





















